ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর দেশটির তেলসম্পদ ব্যবহারের বিষয়ে সরাসরি অবস্থান নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ক্ষমতার ‘নিরাপদ’ পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার তেল উত্তোলন ও ব্যবস্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব দেবে। পাশাপাশি মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে দেশটিতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেলের মজুদ রয়েছে। বিভিন্ন হিসাবে দেশটিতে প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেল আছে বলে ধারণা করা হয়। ট্রাম্পের মতে, এই বিপুল সম্পদ দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। মার্কিন কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করলে ভেঙে পড়া তেল অবকাঠামো সংস্কার হবে এবং দেশটি আবার আয় করতে শুরু করবে—এমনটাই তাঁর দাবি।
তবে জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন মোটেও সহজ নয়। ভেনেজুয়েলার তেল উত্তোলন অর্থবহভাবে বাড়াতে হলে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পাশাপাশি দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে নিতে এক দশক পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।
বর্তমানে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন তুলনামূলকভাবে খুবই কম। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বরে দেশটি দৈনিক গড়ে প্রায় ৮ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন করেছে, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের এক শতাংশেরও কম। অথচ এক দশক আগে এর চেয়ে দ্বিগুণের বেশি তেল উৎপাদন করত দেশটি।
তেল উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা। ২০০০ সালের পর থেকে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন। পরে মাদুরো সরকারও সেই নীতি বজায় রাখে। এর ফলে বহু দক্ষ প্রকৌশলী ও কর্মী দেশ ছেড়ে চলে যান এবং অবকাঠামো ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০১৫ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে। এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যায় এবং নতুন অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। সাম্প্রতিক সময়ে নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হওয়ায় শেভরনের মতো কিছু পশ্চিমা কোম্পানির কার্যক্রমও সীমিত হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলার তেল তুলনামূলকভাবে ‘ভারী ও টক’ প্রকৃতির, যা পরিশোধন করা কঠিন। তবে ডিজেল ও অ্যাসফাল্ট তৈরিতে এই তেল কার্যকর। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র মূলত হালকা ও সহজে পরিশোধনযোগ্য তেল উৎপাদনে অভ্যস্ত, ফলে প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত সমন্বয়ও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আইনি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভেনেজুয়েলায় বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হলে দেশটির নতুন সরকারের সঙ্গে স্পষ্ট চুক্তি প্রয়োজন হবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে এমন বিনিয়োগ অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলেও বৈশ্বিক তেলের বাজারে এর প্রভাব সীমিতই থাকবে। তেলের দাম কিছুটা কমতে পারে, তবে তার জন্য বহু বাধা অতিক্রম করতে হবে এবং তাৎক্ষণিক ফল পাওয়ার সুযোগ খুবই কম।
সব মিলিয়ে, মাদুরো আটক হওয়ার পর ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট হলেও বাস্তবতা বলছে—এই বিপুল সম্পদ কাজে লাগাতে সময়, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিপুল বিনিয়োগ—সবকিছুরই বড় পরীক্ষা দিতে হবে।