বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানো নিয়ে দিল্লির ভেতরে জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর ঢাকার চাপ বাড়লেও, রাজনৈতিক বিবেচনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রশ্নে ভারত দ্বিধান্বিত অবস্থানে রয়েছে। সিএনএনের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করা বা আশ্রয়ে রাখা—উভয় সিদ্ধান্তই ভারতের জন্য কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অধ্যায় তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শেখ হাসিনার পথচলা এক নাটকীয় উত্থান–পতনের গল্প। ট্র্যাজেডি, নির্বাসন ও দীর্ঘ শাসনকাল—সব মিলিয়ে তার জীবন রাষ্ট্রের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা হিসেবেই তিনি রাজনীতিতে আসেন, কিন্তু পরিবারের ওপর হামলার করুণ ঘটনার পরই তার নেতৃত্বের যাত্রা গতি পায়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থান করেন তিনি। কিন্তু সেই উচ্চতা পেরিয়ে আজ তিনি ভারতে আত্মগোপনে, এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার পর তার বিরুদ্ধে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ড তাকে ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত রাজনৈতিক চরিত্রে পরিণত করেছে।
২০২৪ সালের বিরোধী আন্দোলন ও ছাত্রদের নেতৃত্বে বিস্তৃত গণবিক্ষোভ দমনে অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহারের অভিযোগে তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। বিদেশে অবস্থানকালে ঘোষিত এ রায়ে বলা হয়, সরকারিভাবে দমন-পীড়নের নির্দেশদাতা হিসেবে তিনি দায়ী। রায় কার্যকর করতে হলে এখন ভারতের হাতে রয়েছে বড় সিদ্ধান্ত—ঢাকার অনুরোধে তাকে ফেরত পাঠানো হবে কি না।
টানা এক দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতা ধরে রাখার পর গত আগস্টে তিনি দিল্লিতে আশ্রয় নেন। তার প্রস্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার নিশ্চিত করতে ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়ে আসছে। শেখ হাসিনা অবশ্য শুরু থেকেই অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোবাশ্বার হাসান মনে করেন, জনঅসন্তোষ চরমে পৌঁছানোর পর তার দেশত্যাগ ছিল অনিবার্য। তার ভাষায়, “তিনি এমন অবস্থায় পৌঁছেছিলেন যখন জনগণ ও রাষ্ট্রীয় শক্তি উভয়ই তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। সেটিই তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে।” তিনি আরও মনে করেন, পরিস্থিতি এভাবে গড়ানোই তার শাসনকালের সীমা-অতিক্রমের ইঙ্গিত।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের গণহত্যায় পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হারানোর পর শেখ হাসিনা ও তার বোন বিদেশে থাকায় বেঁচে যান। এর পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করে তিনি রাজনীতিতে দৃশ্যমান ভূমিকা নিতে শুরু করেন। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় এসে তিনি পরিবার হত্যার মামলাগুলোর বিচার শুরু করেন, যা তার দীর্ঘদিনের অঙ্গীকারের অন্যতম অংশ ছিল।
২০০৮ সালে আবার ক্ষমতায় ফিরে তিনি আরও শক্ত হাতে শাসনব্যবস্থা স্থাপন করেন। অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ ও আঞ্চলিক সহযোগিতায় পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণও আরও কঠোর হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ সময় থেকেই তার সরকারের কর্তৃত্ববাদী ঝোঁকের বিষয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে।
এদিকে নয়াদিল্লিতে তার বাস এখন তাকে একধরনের পুনঃনির্বাসনের স্মৃতি ফিরিয়ে দিয়েছে। তিনি যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনে ভূমিকা রেখেছিলেন, সেই আদালতই এখন তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছে। অভিযোগ—বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ এবং হত্যার উসকানি।
ভারত–বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও ভারতের নিজস্ব আইনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রভাবিত মামলায় আসামি ফেরত পাঠানো থেকে রাষ্ট্র বিরত থাকতে পারে। ভারতের কয়েকজন সাবেক কূটনীতিক মনে করেন, এখনো শেখ হাসিনার আইনি প্রক্রিয়া শেষ হয়নি, তাই তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না দিল্লি।
অন্যদিকে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাকে দ্রুত হস্তান্তর করলে বিচারিক প্রক্রিয়া এগোতে সুবিধা হবে।
আগামী ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এই মৃত্যুদণ্ড দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। প্রশ্ন জাগছে—এটি কি দীর্ঘ এক উত্তাল অধ্যায়ের সমাপ্তি, নাকি আরও অস্থির সময়ের সূচনা?