আজকাল বাইরে বের হলে দ্রুতই বুঝে যাই—মানুষ যেন মানুষকে নয়, বরং নিজের ফোনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সবার চোখ স্ক্রিনে, হাতে মোবাইল বা ট্যাব। সন্তান পাশে থাকলেও যেন অভিভাবকদের মনোযোগ থাকে ভার্চ্যুয়াল জগতে।
সুইমিং ক্লাসে বাচ্চারা জলে সাঁতরাচ্ছে, আর সাইডলাইনে থাকা মা–বাবারা ডুবে আছেন ফোন বা কিণ্ডল স্ক্রিনে। ভাইবোনেরা অপেক্ষা করছে iPad বা গেম কনসোল নিয়ে। খেলার মাঠেও একই দৃশ্য—ছেলেমেয়েরা প্রাণপণে খেলছে, কিন্তু দর্শক সারিতে থাকা বাবা–মায়েরা উঁচু করে তাকাচ্ছেন না, চোখ আটকে আছে ফোনে। হাফটাইমে শিশুরা যখন দৌড়ে গিয়ে বলছে—“আমি গোল দিলাম!”—তখনও ফোন থেকে চোখ সরিয়ে এক শব্দের উত্তরঃ “হুম… ভালো…”।
রবিবার বিকেলে পার্কে দোলনায় বাচ্চাদের ঠেলতে ঠেলতে দেখি, আশপাশের অধিকাংশ অভিভাবক ব্যস্ত ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, পিন্টারেস্ট বা অন্য অ্যাপ ঘাঁটতে। সন্তানদের সঙ্গে কথা বলা বা খেলায় মনোযোগ দেওয়ার সময় নেই, শুধু ছবি তুলতে একটু থেমে যায়—সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ভালো বাবা–মা’ হিসেবে লাইক সংগ্রহের জন্য।
যখনই শিশু কিছু বলতে চায়, অভিভাবকদের উত্তর—
-
“এই একটু পরে আসছি।”
-
“বিরক্ত করো না। আমি ব্যস্ত।”
-
“একটু এটা শেষ করতে দাও।”
রেস্টুরেন্টে, সিনেমা হলে, লাইনে দাঁড়িয়ে, এমনকি সিগন্যালে থেমে থাকা গাড়িতেও—ফোনই যেন প্রথম অগ্রাধিকার। যেন “আমার প্রিয়”, মানুষের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।
আসলে আমরা নিজেরাই আসক্ত:
আমরা প্রায়ই বলি—বাচ্চারা নাকি স্ক্রিনে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সত্য হলো, তারা আমাদের দেখেই শিখছে। আমরা নিজেরাই প্রথমে এই নেশায় ডুবে আছি। অনেক মা–বাবা স্বীকার না করলেও, ফোন আমাদের মনোযোগকে সবচেয়ে বেশি দখলে রাখে।
এ আসক্তি শুধু পরিবার নয়—মানুষে মানুষে সম্পর্ককেও দুর্বল করছে।
আমাদের বাড়ির কিছু নিয়ম:
এই সমস্যাকে ঠেকাতে আমরা বাড়িতে কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছি—
-
রাতের খাবারের টেবিলে ফোন সম্পূর্ণ বন্ধ
-
অতিথিদের ফোন দরজার পাশে রাখা ‘ফোন বক্সে’
-
খাবারের সময় ও খাবারের পর কোনও স্ক্রিন–টাইম নয়
-
শোবার ঘরে ফোন নিষিদ্ধ
-
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে আরও সচেতনতা
শোনায় কঠোর, কিন্তু এতে পরিবারে বাস্তব সম্পর্ক গড়ে ওঠে। স্ক্রিনের অতিরিক্ত উত্তেজনা থেকে মন কিছুটা হলেও বিশ্রাম পায়।
কেন দরকার ডিজিটাল ডায়েট:
প্রযুক্তি যে প্রয়োজনীয়—এতে কোনও সন্দেহ নেই। টিকটক–ইনস্টাগ্রামে বাচ্চারা বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, আর আমি ফেসবুক দিয়ে ব্যবসা চালাই। ফোনে ম্যাপ আছে, গান আছে, ই–বুক আছে—সুবিধাও অনেক।
কিন্তু যন্ত্র তো যন্ত্রই—মানুষের মতো সম্পর্ক চায় না, তবুও আমরা ওদেরকেই অগ্রাধিকার দিই। আমরা চাই পরিবারকে সময় দিতে, কিন্তু একই সঙ্গে চাই সবার সঙ্গে সব সময় সংযুক্ত থাকতে। দুইটিই একসঙ্গে সম্ভব নয়।
এভাবে চলতে থাকলে অভিভাবক–সন্তানের সম্পর্ক দুর্বল হয়। শিশু যদি আমাদের মনোযোগ না পায়, তবে তাদের ভিতরে নিরাপত্তা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ—এসবই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা মনখুলে কথা বলবে না, নিজেদের জীবনে আমাদের অংশীদার করবে না। ফলে আমরা সেই ভালো বাবা–মা হয়ে উঠতে পারব না, যেটা তারা সত্যিই চায়।
তাই একটু থামুন—ফোনটা নামিয়ে রাখুন:
মানুষ মানুষের সঙ্গে কথা বলার জন্যই তৈরি। চোখে চোখ রেখে, মন দিয়ে শোনা—এই সংযোগটাই সবচেয়ে মূল্যবান।
তাই ফোনটাকে একটু ছুটি দিন।
আর নিজের পরিবারকে সময় দিন—যেভাবে ভালোবাসা দেওয়া উচিত, সরাসরি, অন্তর দিয়ে।