জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে করার সরকারি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী—পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ঘোষণায় বিএনপি ধন্যবাদ জানিয়ে সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে, অন্যদিকে জামায়াত ও সমমনা আট দল এই সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়ে গণভোটকে নির্বাচনের আগে সম্পন্ন করার দাবি তুলেছে।
বৃহস্পতিবার রাতে গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে ভার্চ্যুয়ালি সভায় সভাপতিত্ব করেন। সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং একই দিনে গণভোট অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছেন। এ ঘোষণায় বিএনপির পক্ষ থেকে তাঁকে ধন্যবাদ জানানো হয়।

মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটি ১৭ অক্টোবর ঐকমত্যের ভিত্তিতে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের ওপর জনগণের সম্মতি গ্রহণের জন্য গণভোট অনুষ্ঠান এবং দ্রুত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজনের জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। বিএনপি মনে করে, জুলাই জাতীয় সনদে উল্লিখিত সংস্কার ও ঐক্যের রূপরেখা জনগণের অনুমোদন পেলে তা ভবিষ্যতের সরকারের নীতিনির্ধারণে দিকনির্দেশনা দেবে।
স্থায়ী কমিটির সভায় খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, সালাউদ্দিন আহমদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন ও হাফিজ উদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে একই রাতে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সমমনা আট দলের বৈঠক শেষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে দলের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, জুলাই সনদ জারির জন্য প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানালেও নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে করার সিদ্ধান্ত বিভ্রান্তিকর ও অগ্রহণযোগ্য। তাঁর মতে, জনগণের রায় যাচাই না করেই নির্বাচনে যাওয়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থী।

সৈয়দ তাহের বলেন, প্রধান উপদেষ্টা গণভোট ও নির্বাচন একসঙ্গে করার পক্ষে দুটি “ঠুনকো যুক্তি” দিয়েছেন—একটি খরচ বাঁচানোর, অন্যটি প্রশাসনিক সুবিধার। কিন্তু জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্নে খরচের অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়। বাজেট জনগণের কল্যাণে হয়, সেখানে গণভোটের খরচ জাতির স্বার্থের তুলনায় তুচ্ছ। তিনি অভিযোগ করেন, গণভোট ও নির্বাচন একসঙ্গে হলে জনগণের রায় অস্পষ্ট হয়ে যাবে এবং গণভোটে জনগণ যা ‘হ্যাঁ’ বলবে, তা বাস্তবায়নে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হবে।
জামায়াতের এই নেতা আরও বলেন, সমমনা দলগুলো বরাবরই বলে আসছে—জুলাই সনদের কোন অংশ জনগণ গ্রহণ করেছে আর কোনটি করেনি, সেটি আগে নির্ধারণ করা জরুরি। জনগণের রায় পাওয়ার পরই নির্বাচন হওয়া উচিত। জনগণ যদি সনদের কিছুই গ্রহণ না করে, তাহলে আগের সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন করা হোক।
তিনি জানান, আট দলের পক্ষ থেকে শুক্রবার বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানানো হবে। একই সঙ্গে নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবিতে ঘোষিত দেশব্যাপী বিক্ষোভ ও সমাবেশ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণার পর বিএনপি ও জামায়াতের এই বিপরীত প্রতিক্রিয়া বিরোধী রাজনীতিতে নতুন বিভাজনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত কয়েক মাসে বিএনপি ও জামায়াত সমমনা জোটের অংশ হয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে একযোগে অবস্থান নিলেও নির্বাচন ও গণভোট ইস্যুতে দুই দলের কৌশলগত ভিন্নতা এখন স্পষ্ট। বিএনপি যেখানে নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, জামায়াত সেখানে গণভোট আগে করার দাবি তুলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সময়ক্ষেপণ চায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অবস্থান বিরোধী জোটের ঐক্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক (অব.) ড. মাহবুব হোসেন মনে করেন, বিএনপি এখন নির্বাচনের মাধ্যমে বৈধতা অর্জনের পথে এগোচ্ছে, আর জামায়াত গণভোটের মাধ্যমে রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত করতে চায়। এটি কৌশলগত পার্থক্য হলেও তার রাজনৈতিক পরিণতি বড় হতে পারে।
একই ঘোষণায় দুই প্রধান বিরোধী দলের বিপরীত প্রতিক্রিয়া রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে আয়োজনের এই উদ্যোগ দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে ঐক্য না বিভক্তি—কোনটি বাড়াবে, তা এখন সময়ই নির্ধারণ করবে।