রাজধানীর পুরান ঢাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত তারিক সাইফ মামুনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। গ্রেপ্তারদের মধ্যে দুইজন ‘শুটার’ রয়েছেন, যাঁরা সরাসরি মামুনকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ডিবির যুগ্ম কমিশনার নাসিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, রাজধানী ও বিভিন্ন জেলায় অভিযান চালিয়ে মঙ্গলবার দিনভর এই পাঁচজনকে আটক করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি পিস্তল ও বেশ কিছু গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারদের মধ্যে রুবেল ও ইব্রাহিম নামে দুই ভাড়াটে শুটার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের ধরা হয়।
ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, সূত্রাপুরে সংঘটিত মামুন হত্যা মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বুধবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হবে।
গত সোমবার (১০ নভেম্বর) সকাল ১১টার দিকে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফটকের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় তারিক সাইফ মামুনকে। আদালতে হাজিরা শেষে বেরিয়ে আসার সময় তাঁকে লক্ষ্য করে দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেল থেকে নেমে এলোপাতাড়ি গুলি চালান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অন্তত ছয় থেকে সাত রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সকাল ১০টা ৫২ মিনিটে মামুন গলি থেকে মূল সড়কের দিকে যাচ্ছিলেন। কিছুক্ষণ পরই তাঁকে দৌড়ে ফিরতে দেখা যায়, পেছনে দুজন বন্দুকধারী তাঁর দিকে গুলি ছুড়ছেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন।
ঘটনার পর তাঁকে প্রথমে পাশের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলেও পরে চিকিৎসকরা তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। চিকিৎসকেরা জানান, মামুনের শরীরে মাথা, বুক, পিঠ ও হাত মিলিয়ে সাতটি গুলির চিহ্ন ছিল।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, মামুন হত্যায় মোহাম্মদপুর, হাজারীবাগ ও পুরান ঢাকার কয়েকজন পেশাদার সন্ত্রাসী জড়িত। তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ভাড়ায় খুন, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির মতো অপরাধে সক্রিয়। এর মধ্যে কয়েকজন আলোচিত সন্ত্রাসী ‘পিচ্চি হেলাল’-এর অনুসারী বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তবে নিহত মামুনের স্ত্রী বিলকিস আক্তার দীপা দাবি করেন, তাঁর স্বামীকে হত্যা করেছে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের লোকজন। তিনি বলেন, “ইমনের লোকজন আগেও মামুনের ওপর হামলা করেছিল, এবার তারা পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে।”
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিহত মামুন ও সানজিদুল ইসলাম ইমন একসময় একই অপরাধচক্রের সদস্য ছিলেন। ‘ইমন-মামুন বাহিনী’ নামে পরিচিত এই গ্রুপ রাজধানীর হাজারীবাগ, তেজগাঁও ও মোহাম্মদপুর এলাকায় দীর্ঘদিন সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাত। তারা চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী ও সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যা মামলার আসামিও ছিলেন।
এর আগেও মামুনের ওপর একাধিকবার হামলা হয়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে তেজগাঁওয়ে এক হামলায় তিনি অল্পের জন্য বেঁচে যান, যেখানে এক আইনজীবী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
নিহতের পরিবার জানায়, মামুন দুই দিন আগে আফতাবনগরের বাসা থেকে আদালতে হাজিরা দিতে বেরিয়েছিলেন। এর কিছুক্ষণ পরই তাঁর মৃত্যুর খবর পান তাঁরা।
পুলিশ বলছে, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পুরনো শত্রুতার জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ পাওয়া যাবে বলে আশা করছে গোয়েন্দা বিভাগ।