জামায়াতে ইসলামী আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সমমনা দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠনের পরিকল্পনা বাতিল করে আসনভিত্তিক সমঝোতার পথে হাঁটছে। প্রায় এক বছর ধরে জোট গঠনের চেষ্টা চালানোর পর হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি জামায়াতের একটি কৌশলগত পরিবর্তন, যার মাধ্যমে একাধিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে নির্বাচনের অংশগ্রহণমূলক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিএনপির মতো কিছু আসন সমমনাদের জন্য ছেড়ে দিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরিবেশ তৈরির দিকেও নজর দিচ্ছে দলটি।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, তারা প্রচলিত অর্থে কোনো জোট করছে না। সমমনাদের সঙ্গে বসে এমন সমঝোতা করা হবে, যাতে একই আসনে একাধিক প্রার্থী না থাকে। তাঁর ভাষায়, জোট গঠনের জন্য যে সাংগঠনিক কাঠামোর প্রয়োজন, তা এখন জরুরি নয়। সবাই মিলে নির্দিষ্ট আসনে প্রার্থী নির্ধারণ করলেই উদ্দেশ্য পূরণ হবে।
দলের আমির শফিকুর রহমানও সাংবাদিকদের বলেছেন, “আমরা কোনো জোট করছি না। প্রতিটি আসনে একক প্রার্থী নিশ্চিত করার নীতিতেই আমরা এগোচ্ছি।”
২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটে ছিল জামায়াত। সেই নির্বাচনে জোট ক্ষমতায় আসার পর দলটির দুজন নেতা মন্ত্রী হন। কিন্তু ২০২২ সালের ডিসেম্বরে জোট ভেঙে যাওয়ার পর বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক অনেকটা দূরত্বে চলে যায়।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জামায়াত ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দলকে সঙ্গে নিয়ে জোট গঠনের চেষ্টা করেছিল। বরিশালে ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিমের (চরমোনাই পীর) সঙ্গে জামায়াত আমিরের সাক্ষাতের পর বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
তবে দীর্ঘ আলোচনার পরও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো জোট গঠনের ঘোষণা না দিয়ে দলটি এখন আসনভিত্তিক সমঝোতার সিদ্ধান্তে এসেছে। খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের জানিয়েছেন, শুরু থেকেই তাদের লক্ষ্য ছিল নিজেদের মধ্যে ভোট বিভক্তি এড়ানো।
জামায়াত সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় পর্যায়ে ইতিমধ্যে কিছু আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রার্থী তালিকা প্রকাশের আগে সমমনাদের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির চূড়ান্ত আলোচনা হবে। প্রয়োজনে কিছু প্রার্থী নিজেদের আসন থেকে সরে দাঁড়াবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর মনে করেন, জোটের পরিবর্তে আসনভিত্তিক সমঝোতা দলগুলোর জন্য বেশি সুবিধাজনক। এতে নির্বাচন-পরবর্তী সমঝোতার ঝামেলা এড়ানো যায় এবং সবাই নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান অটুট রাখতে পারে। তাঁর মতে, এতে নির্বাচনে বহু দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরিবেশও তৈরি হবে।
বর্তমানে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ মূলত বিএনপি, জামায়াত ও তাদের সমমনাদের হাতে। পর্যবেক্ষকদের মতে, জামায়াতের এই “জোট নয়, সমঝোতা” নীতি মূলত একটি কৌশল—যার মাধ্যমে দলটি নির্বাচনে সক্রিয় উপস্থিতি বজায় রাখতে চায়, একই সঙ্গে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণের দিকেও চোখ রাখছে।