বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা দিয়েছে, গত তিনটি নির্বাচনে যারা ‘ন্যূনতম সংশ্লিষ্টতা’ বা ‘ন্যূনতম অংশগ্রহণ’ করেছিলেন, তাদের কাউকেই আগামী নির্বাচনে কোনো ধরনের দায়িত্বে রাখা হবে না। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ও প্রশ্ন উঠেছে। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত ঢালাও ও বাছবিচারহীন। এতে আমলাতন্ত্রে অনিশ্চয়তা ও বিভাজন তৈরি হতে পারে। তারা মনে করছেন, এই ধরনের ‘সর্বজনীন অনাস্থা’ কর্মকর্তাদের মধ্যে কাজের আগ্রহ কমিয়ে দেবে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জটিলতা বাড়াবে।
সাবেক যুগ্ম সচিব বিজন কান্তি সরকার বলেন, “যারা বিতর্কিত ছিলেন বা পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছেন, তাদের বাদ দেওয়াই উচিত। কিন্তু সবাইকে একসাথে অযোগ্য ঘোষণা করা যুক্তিযুক্ত নয়। তাহলে নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবে কারা?” অন্যদিকে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, “নির্বাচনের সময় মাঠ প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা রাজনৈতিক চাপে থাকেন। তাদের অনেকেই বাধ্য হয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। ঢালাওভাবে সবাইকে অযোগ্য বলা হলে নিরীহ কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং প্রশাসনে আস্থার সংকট তৈরি হবে।” নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দায়িত্ব বণ্টনের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, “যারা বিতর্কিত বা পক্ষপাতমূলক হিসেবে চিহ্নিত হবেন, তারা বাদ পড়বেন—এটা নিশ্চিত। তবে সেটি নির্ধারিত হবে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।” প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সাম্প্রতিক এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়োগে কঠোর মানদণ্ড প্রযোজ্য হবে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, “যেসব কর্মকর্তা গত তিন নির্বাচনে কোনোভাবে জড়িত ছিলেন, তাদের কোনো দায়িত্বে রাখা হবে না। যাচাইয়ের সময় তাদের এসিআর, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, কর্মদক্ষতা ও পূর্বের পোস্টিং বিশ্লেষণ করা হবে।” তিনি আরও বলেন, “ডিসি, এডিসি, ইউএনও এবং যারা পূর্বে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্বে ছিলেন, তাদের নতুন নির্বাচনে দায়িত্ব না দেওয়ার বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সহায়তায় কাজ শুরু হয়েছে।” বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ আমলের ডিসি ও এসপি নিয়োগ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে বলেন, “অতীতের সব কর্মকর্তাকে বাদ দিয়ে নতুনভাবে নির্বাচন পরিচালনা করা বাস্তবসম্মত নয়। বরং যারা রাজনৈতিক চাপে অন্যায় করেছেন, তাদের এখন গণতান্ত্রিকভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া উচিত।” তবে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রভাবমুক্ত রাখার দাবিতে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো এই সিদ্ধান্তকে ‘বাধ্যতামূলক ও সময়োপযোগী’ বলে সমর্থন জানিয়েছে।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় মাঠপর্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ রিটার্নিং অফিসার, যিনি পুরো জেলার নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন। সাধারণত জেলা প্রশাসক বা উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা এই পদে থাকেন। তাদের অধীনে কাজ করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও), যারা সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে ভোটকেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসাররা নির্বাচনের মূল কার্যক্রম সম্পন্ন করেন। এদের মধ্যে অনেকেই সরকারি স্কুল, কলেজ বা ব্যাংকের কর্মকর্তা। ফলে গত তিন নির্বাচনে দায়িত্ব পাওয়া কর্মকর্তাদের একসাথে বাদ দিলে নতুন জনবল খুঁজে পাওয়া প্রশাসনের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন অনেকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে প্রশাসনের এমন অস্থিরতা ভোটের বিশ্বাসযোগ্যতায় প্রভাব ফেলতে পারে। সরকারের উচিত হবে পরিষ্কার মানদণ্ড ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মকর্তাদের বাছাই করা।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া বলেন, “যদি এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কোনো গোষ্ঠীকে সরিয়ে আরেক গোষ্ঠীকে সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে তা আমলাতন্ত্রে নতুন বিভাজন তৈরি করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হবে।” বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের তালিকা অনুযায়ী সারাদেশে ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্র এবং ২ লাখ ৪৬ হাজার ৭৩৯টি ভোটকক্ষ থাকবে। নির্বাচনের আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করতে রিটার্নিং অফিসারদের পাশাপাশি পুলিশ, প্রশাসন ও সেনাবাহিনীও নির্ধারিত ভূমিকা পালন করবে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে ‘ন্যূনতম সংশ্লিষ্টতা’ থাকা কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সরকারের নির্বাচনী প্রস্তুতিতে একটি বড় পরিবর্তন আনছে। তবে এই প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে বাস্তবায়িত হবে—এখন সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।