রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর শিয়ালবাড়ি এলাকায় মঙ্গলবারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু আমাদের আবারও এক করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। একটি পোশাক কারখানা ও পাশের কেমিক্যাল গুদামে লেগে যাওয়া আগুন মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু গ্রাস করে নেয়। উদ্ধারকর্মীরা যখন একের পর এক মরদেহ বের করছেন, তখন পুরো এলাকা জুড়ে ছিল পোড়া কাপড়, রাসায়নিকের গন্ধ আর অসহায় মানুষের আর্তনাদ। এটি নিছক একটি দুর্ঘটনা নয়—বরং এটি আমাদের অব্যবস্থাপনা, অবহেলা ও দায়হীনতার জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশে প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও আগুন লাগে। কখনও পুরান ঢাকার রাসায়নিক গুদামে, কখনও বস্তির ঝুপড়িতে, আবার কখনও বহুতল ভবনের অফিস বা পোশাক কারখানায়। প্রতিবারই প্রাণহানি ঘটে, কোটি টাকার ক্ষতি হয়, তদন্ত কমিটি গঠিত হয়—কিন্তু ফলাফল থাকে একই জায়গায়। কারণ, আমরা আগুন নেভাতে শিখেছি, কিন্তু আগুন লাগা রোধে শিখিনি।
মিরপুরের ঘটনার ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, কেমিক্যাল গুদামটি অনুমোদনবিহীন ছিল। দাহ্য পদার্থে ভরা এমন একটি স্থাপনা জনবসতিপূর্ণ এলাকায় কীভাবে গড়ে উঠল, তা প্রশাসনের নজর এড়িয়ে গেল কীভাবে—এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে চায় না। অগ্নি নিরাপত্তা মানদণ্ড না মানা, ফায়ার সেফটি সিস্টেম না থাকা, জরুরি বহির্গমন পথ বন্ধ থাকা—এসব যেন এখন আমাদের শহুরে বাস্তবতা।
ঢাকা শহরের অধিকাংশ ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ। ফায়ার সার্ভিসের জরিপ অনুযায়ী, রাজধানীর প্রায় ৭৫ শতাংশ ভবন অগ্নিনিরাপত্তা মানে উত্তীর্ণ নয়। অথচ এসব ভবনে প্রতিদিন হাজারো মানুষ কাজ করেন, ব্যবসা করেন, জীবন নির্বাহ করেন। একটি স্ফুলিঙ্গই মুহূর্তে শত প্রাণ কেড়ে নিতে পারে—এটি সবাই জানে, তবুও কেউ কিছু করে না।
অগ্নিকাণ্ডের পর প্রতিবারই শোনা যায় একই প্রতিশ্রুতি—“তদন্ত চলছে”, “দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে”, “নিরাপত্তা জোরদার করা হবে”। কিন্তু তদন্তের ফলাফল খুব কমই প্রকাশিত হয়, দায়ীদের জবাবদিহিও দেখা যায় না। এভাবেই একের পর এক ট্র্যাজেডি কেবল সংখ্যা বাড়ায়, শিক্ষা দেয় না।
এখন সময় এসেছে কথার নয়, কার্যকর পদক্ষেপের।
প্রথমত, জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে সব কেমিক্যাল গুদাম অবিলম্বে সরিয়ে নেওয়া দরকার।
দ্বিতীয়ত, অগ্নি নিরাপত্তা সনদ ছাড়া কোনো ভবন বা কারখানা চালু রাখার অনুমতি দেওয়া যাবে না।
তৃতীয়ত, ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আইনের প্রয়োগে কঠোরতা নিশ্চিত করতে হবে।
মিরপুরের অগ্নিকাণ্ড আমাদের জন্য আরেকটি সতর্কবার্তা। যদি এখনো আমরা না শিখি, না জাগি, তাহলে এমন ট্র্যাজেডি বারবার ঘটবে, আরও মানুষ হারাবে প্রাণ, আর আমরা শুধু সংখ্যা গুনব। আগুনের শিখায় নয়—এবার দায়বদ্ধতার আলোয় আলোকিত হোক বাংলাদেশ।