স্পেন থেকে ইতালি, পর্তুগাল ও ফ্রান্স, আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। কোথাও তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান, কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগ। আলবেনিয়াতেও ছড়িয়ে পড়েছে সরকারবিরোধী আন্দোলন।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আবাসনসংকট, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি পরিষেবার অবনতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ জোরালো হয়ে উঠেছে। স্পেন ও ফ্রান্সে শুরু হওয়া আন্দোলনের প্রভাব এবার ইতালি ও পর্তুগালেও দেখা যাচ্ছে। একই সময়ে আলবেনিয়ায় শিক্ষা ও সরকারি নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিয়েছে।
গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবরের ঘটনাপ্রবাহে আন্দোলনের ধরন দেশভেদে আলাদা হলেও মানুষের অসন্তোষের কেন্দ্রে রয়েছে একই প্রশ্ন: আয় ও সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাধারণ মানুষ কি আর্থিকভাবে টিকে থাকতে পারছেন? কোথাও বাড়িভাড়া মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন ভাড়াটেরা, কোথাও দুর্বল সরকারি পরিষেবা ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ জমেছে। ইতালি ও আলবেনিয়ায় বিক্ষোভের একাংশ সহিংসতায় রূপ নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
মিলানে বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
ইতালির মিলানে গত শনিবার জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে একটি মিছিল শুরুতে শান্তিপূর্ণ ছিল। পরে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ দাঙ্গা পুলিশের দিকে পাথর, রাস্তার পাকা ব্লক ও অন্যান্য বস্তু ছুড়তে শুরু করে। রেস্তোরাঁর টেবিল দিয়ে তৈরি ব্যারিকেডেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। ইতালির সংবাদ সংস্থা লাপ্রেসের বরাতে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, সংঘর্ষে অন্তত দুই পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন এবং প্রায় ৫০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্করাও রয়েছেন।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেছেন, বিক্ষোভ করা মানুষের অধিকার। তবে শহরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া বা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ওপর হামলা চালানো সেই অধিকারের মধ্যে পড়ে না।
মিলানের মেয়র জিউসেপ্পে সালাও বিক্ষোভের পেছনে থাকা সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্বেগের যৌক্তিকতা স্বীকার করেছেন। তবে পুলিশের ওপর হামলা এবং শহরের সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিকে তিনি সমর্থনযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন।
লিসবনে তাঁবু খাটিয়ে প্রতিবাদ, আবাসন ব্যয় বেড়েছে ১২৪ শতাংশ
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে আবাসনসংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শনিবার থেকে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছেন বিক্ষোভকারীরা। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা হাজারো মানুষ মিছিলে অংশ নেন। রাতে পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় রোসিও চত্বরে কয়েক শ মানুষ জড়ো হন। তাঁরা রাজা চতুর্থ পেদ্রোর ভাস্কর্যের চারপাশে বসে গান গেয়ে রাত কাটানোর ঘোষণা দেন।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ৪৬ বছর বয়সী সমাজকর্মী এলেনা কস্তার ভাষায়, কর দিয়ে এবং শ্রমের মাধ্যমে দেশ সচল রাখা মানুষই এখন নিজেদের অধিকার হারাচ্ছেন। বিশেষ করে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন পাওয়ার অধিকার সংকুচিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি বোঝাতেই তিনি বলেন, ‘আমাদের দম বন্ধ হয়ে আসছে।’
পর্তুগালের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশটিতে আবাসন ব্যয় বেড়েছে ১২৪ শতাংশ। এই বৃদ্ধি একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় বাড়িভাড়া বৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ। এর প্রভাব বিশেষভাবে পড়েছে তরুণ, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবার এবং লিসবনের বাসিন্দাদের ওপর।
বিক্ষোভকারী প্রকৌশলী আন্তোনিও মারগাদো অভিযোগ করেন, বাড়ির মালিকদের স্বার্থ সুরক্ষায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, অথচ যাঁদের ভাড়া দিয়ে থাকার সামর্থ্য কম, তাঁদের সুরক্ষা যথেষ্ট নয়।
লিসবনের এই আন্দোলনের আগে উত্তরাঞ্চলীয় শহর পোর্তোতেও তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান শুরু হয়েছিল। এর আগে প্রধান শ্রমিক সংগঠন সিজিটিপির আয়োজনে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে উন্নত সরকারি পরিষেবা, পেনশন ও মজুরির পাশাপাশি আবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের দাবি জানানো হয়।
প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্টেনেগ্রো বলেছেন, সরকারি নীতির ঘাটতি নিয়ে মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের বিষয়টি সরকার বুঝতে পারছে। তবে তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অন্য দেশ থেকে অস্থিতিশীলতার পরিবেশ আমদানি না করার আহ্বান জানিয়েছেন।
স্পেনে এক বৃদ্ধার উচ্ছেদ ঘিরে আবাসন আন্দোলন
স্পেনে আবাসনসংকট নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে নতুন মাত্রা পায়। এর কেন্দ্রে ছিলেন ৮৭ বছর বয়সী মারিয়া দেল কারমেন আবাসকাল, যিনি মাদ্রিদে সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করা ভাড়া বাসা থেকে উচ্ছেদের শিকার হন।

বিনিয়োগপ্রতিষ্ঠান তাঁর বাসাটি অধিগ্রহণের পর ভাড়া ২৩০ শতাংশ বাড়ানোর দাবি জানায়। এই বাড়তি ভাড়া বহন করতে না পারায় ২৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে বাসা ছাড়তে হয়। পরে ৭ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর উচ্ছেদ ও মৃত্যুর ঘটনা স্পেনে আবাসনের অধিকার নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি করে।
তাঁর ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাদ্রিদসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ, উচ্ছেদে সুরক্ষা এবং আবাসনকে কেবল বিনিয়োগের পণ্য হিসেবে বিবেচনা না করার দাবি জানান।
আবাসনসংকট মোকাবিলায় স্পেনের সমাজতান্ত্রিক নেতৃত্বাধীন সরকার জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু কংগ্রেসে ডানপন্থী ও কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর বিরোধিতায় প্রস্তাবগুলো অনুমোদন পায়নি। এরপর প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ আগাম সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। নির্বাচন ২৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা বলে স্পেনের সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে।
এই সংকট স্পেনে শুধু বাড়িভাড়ার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। আবাসনের ঘাটতি, বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা, তরুণদের বাড়ি কেনা বা ভাড়া নেওয়ার অসুবিধা এবং শহরগুলোতে বসবাসের ক্রমবর্ধমান ব্যয় এখন বড় রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে।
ফ্রান্সে বিক্ষোভে গ্রেপ্তার ১২০০ ছাড়িয়েছে
ফ্রান্সে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় প্যারিসের উত্তরের দরিদ্র শহরতলির স্কুলগুলোতে শিক্ষকের অনুপস্থিতি, দুর্বল অবকাঠামো এবং শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ থেকে। পরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক বৈষম্য, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি পরিষেবায় ঘাটতি এবং মজুরি-পেনশন নিয়ে বৃহত্তর প্রতিবাদে।

গত শনিবার দেশজুড়ে বিক্ষোভের সময় বিভিন্ন শহরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। কিছু স্থানে ভবনে আগুন দেওয়া, দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, সেদিন ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের সদস্যদেরও আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
প্যারিসের পাশাপাশি লিমোজ, মার্সেই ও অন্যান্য শহরেও সহিংসতার খবর এসেছে। ফরাসি সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহিংসতা এবং সম্পত্তি ধ্বংসের নিন্দা জানিয়েছে। তবে বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভের পেছনে থাকা শিক্ষা, সামাজিক বৈষম্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সমস্যাগুলোও দেশটির রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
আলবেনিয়ায় সরকারবিরোধী আন্দোলনও সহিংস
আলবেনিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ, উচ্চ টিউশন ফি এবং সরকারের নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিয়েছে। বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগ দাবি করছেন।
গত শনিবার বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দিকে পাথর, পেট্রলবোমা, ধাতব বস্তু ও আতশবাজিজাতীয় বিস্ফোরক ছোড়েন। গাড়ি ও ময়লার পাত্রে আগুন ধরিয়ে সেগুলো পুলিশের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে ব্যবহার করা হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে পুলিশ রাবার বুলেট ব্যবহার করে। আদালত, ব্যাংক ও ডাকঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ ও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
দেশটিতে কয়েক মাস ধরে সরকারবিরোধী অসন্তোষ চলছিল। বিতর্কিত একটি পর্যটন রিসোর্ট নির্মাণ প্রকল্প, যার সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রেক্ষাপট। শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অসন্তোষের সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষোভ যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
একই সংকট, ভিন্ন ভিন্ন প্রতিবাদ
ইউরোপের এই বিক্ষোভগুলোকে একই ধরনের আন্দোলন বলা যাবে না। স্পেন ও পর্তুগালে আবাসনসংকট এবং বাড়িভাড়া প্রধান বিষয়। ইতালিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে প্রতিবাদ হয়েছে। ফ্রান্সে শিক্ষা ও সরকারি পরিষেবার অবনতির সঙ্গে বৃহত্তর অর্থনৈতিক অসন্তোষ যুক্ত হয়েছে। আর আলবেনিয়ায় শিক্ষা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও বিতর্কিত উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে ক্ষোভ সামনে এসেছে।
তবে দেশগুলোর ঘটনাপ্রবাহে একটি সাধারণ প্রবণতা স্পষ্ট: মানুষের আয় ও সামাজিক সুরক্ষার তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেলে এবং সরকারি নীতির ওপর আস্থা কমে গেলে ক্ষোভ দ্রুত রাজপথে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিশেষ করে আবাসন এখন ইউরোপের বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন। বাড়িভাড়া ও বাড়ির দাম বাড়তে থাকলে তরুণদের স্বাধীনভাবে বসবাস, পরিবার গঠন এবং শহরে কাজ ধরে রাখার সুযোগ সংকুচিত হয়। ফলে আবাসনসংকট শুধু ব্যক্তিগত আর্থিক সমস্যাই নয়, বরং সামাজিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক অসন্তোষেরও উৎস হয়ে উঠছে।
তবে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট সাধারণ মানুষের দাবিকে সামনে আনার বদলে আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ইউরোপের সরকারগুলোর সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ: আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং একই সঙ্গে আবাসন, শিক্ষা, মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের বাস্তব উদ্বেগের কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করা।