শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে এক মাস আগে ফ্রান্সে শুরু হওয়া আন্দোলন এখনো অব্যাহত রয়েছে। আন্দোলনে সম্পৃক্ততার অভিযোগে রাজধানী প্যারিসের মহানগর এলাকায় এক মাসে রেকর্ড ১ হাজার ২৬০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ৮৬ শতাংশই নাবালক। দেশটিতে এর আগে কোনো আন্দোলনে এত বেশি মানুষ গ্রেপ্তারের নজির নেই। এদিকে শনিবার দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দ জেফ্রে জানিয়েছেন, দেশজুড়ে প্রায় ২০০টি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা এখনো আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু বলেছেন, বিক্ষোভ এখন আর শুধু শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি ‘শহুরে সহিংসতার আন্দোলনে’ রূপ নিয়েছে। রাজধানী প্যারিসসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় ‘সহিংসতার উসকানি দেওয়ার মতো অত্যন্ত জঘন্য আহ্বান’-এরও তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন তিনি।
লেকর্নু জানান, স্কুল ভবনসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। একই সঙ্গে বিক্ষোভের শেষ পর্যায়ে ঘটে যাওয়া সহিংস ঘটনার সমালোচনাও করেন তিনি।
শিক্ষামন্ত্রী জেফ্রে জানান, ফ্রান্সের উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্ল্যাটফর্ম ‘পারকুরসুপ’-এর মাধ্যমে সরকার পুরো ভর্তি প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করছে। অক্টোবরের শেষ নাগাদ এ বিষয়ে নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
বৃহস্পতিবার দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের গ্রাদিগনান এলাকার একটি উচ্চ বিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে তিনি বলেন, “সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে, তবে আপাতত আমরা এ নিয়ে কাজ করছি।”
জেফ্রে আরও জানান, সরকার ৩ হাজার বিকল্প শিক্ষক নিয়োগের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তাঁদের দুই-তৃতীয়াংশকে ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্কুলে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, গ্রাদিগনানে বিশেষ সমস্যার মুখে থাকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃহস্পতিবারের ১১৪টি থেকে কমে ৪৭টিতে দাঁড়িয়েছে।
“আশা করি, শরতের ছুটির পর যখন ফের স্কুলগুলোতে ক্লাস শুরু হবে, তখন কোনো হাই স্কুল আর ‘রেড জোন’ বা ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় থাকবে না”, গ্রাদিগনানে বলেছেন জেফ্রে।
এর আগে ৮ অক্টোবরের এক বৈঠকে ‘লে লিসিয়েনস!’ ও ‘ইউনিয়ন সিন্ডিকাল লিসিয়েন’-এর মতো শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল।
প্যারিসের পশ্চিমে জুই-এন-জোসা এলাকায় অবস্থিত ব্যবসায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এইচইসি প্যারিসেও ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ। সেখানে উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সমর্থনে বিক্ষোভ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন শুরুর পর এই প্রথম সেখানে এমন ঘটনা ঘটল।
লিওঁ শহরের প্রশাসন বৃহস্পতিবার সকালে নির্ধারিত একটি ছাত্র বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করেছে। প্রশাসনের ভাষ্য, আগের বিক্ষোভগুলোতে জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়া, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতি এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল।
প্যারিস, মার্সেই ও লিওঁ শহরের বেশ কয়েকটি স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অবরোধ কর্মসূচি এখনো চলছে। প্যারিস পুলিশ জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে প্যারিস মহানগর এলাকায় ১ হাজার ২৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের ৮৬ শতাংশই নাবালক।
পরিস্থিতি নিয়ে হালনাগাদ তথ্যে প্যারিস পুলিশ আরও জানিয়েছে, প্রায় এক মাসের বিক্ষোভে ২৮৬ জন পুলিশ ও জেন্ডার্ম এবং শিক্ষা বিভাগের ১৩ জন কর্মী আহত হয়েছেন।
এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, “সহিংসতা বারবার ঘটছে এবং এর তীব্রতা বাড়ছে। গত ১৩ অক্টোবর বিক্ষোভের সময় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর ৭১ জন সদস্য আহত হয়েছেন।”
গত ১৭ সেপ্টেম্বর প্যারিসের একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অপর্যাপ্ত শিক্ষক, স্কুলের দীর্ঘ সময়সীমা এবং শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তির প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করেন।
রাজধানীর শহরতলির ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা একত্র হয়ে এসব সমস্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভে নামেন। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বা ‘ক্লাস সাইজ’ নিয়েও অভিযোগ তোলেন তাঁরা।
পরে এই বিক্ষোভ রাজধানীসহ ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকার বিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তা শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক সংস্কারের দাবিতে রূপ নেয়। আন্দোলনে শত শত শিক্ষক ও শিক্ষার্থী অংশ নেন। বর্তমানে পুরো ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়েছে এই আন্দোলন।