স্পেনে হঠাৎ করেই সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা আসলো কেন? একটি আবাসন বিল কংগ্রেসে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার সঙ্গে নির্বাচনের সম্পর্কই বা কোথায়? অনেকের কাছেই বিষয়টি প্রথমে ধোঁয়াশার মতো মনে হতে পারে। কিন্তু গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ দেখলে বোঝা যায়, কংগ্রেসে একটি ভোটই ছিল আসলে বড় রাজনৈতিক সংকটের শেষ ধাক্কা।
প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ৫ অক্টোবর ঘোষণা করেছেন, আগামী ২৯ নভেম্বর ২০২৬ (N29) স্পেনে আগাম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তার ঠিক তিন দিন আগে, ২ অক্টোবর, স্পেনের কংগ্রেসে সরকারের দুটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসন-সংক্রান্ত জরুরি ডিক্রি প্রত্যাখ্যাত হয়। এরপরই কার্যত বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ করার সিদ্ধান্ত নেন সানচেজ।
যে দুটি প্রস্তাব নিয়ে এত বড় সংকট
বিষয়টি ছিল স্পেনের ভয়াবহ আবাসন ও বাড়িভাড়া সংকট মোকাবিলার জন্য সরকারের আনা দুটি রয়্যাল ডিক্রি-ল (Real Decreto-ley)।
এর মধ্যে ছিলো-
ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষা বাড়ানো, উচ্ছেদ ঠেকানোর ব্যবস্থা এবং অস্থায়ী ও কক্ষভিত্তিক ভাড়ার ওপর নিয়ন্ত্রণসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ। একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ছিল নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে উচ্ছেদের সুরক্ষা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো।
এই প্রস্তাবগুলো কেন এত জরুরি? কারণ, স্পেনে বাড়িভাড়া ও বাসস্থানের খরচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাধারণ মানুষের জন্য বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ভাড়া দিতে না পারা, বাড়ি খুঁজে না পাওয়া এবং উচ্ছেদের আশঙ্কা নিয়ে দেশজুড়ে ক্ষোভ বাড়ছিল।
এই ক্ষোভ আরও তীব্র হয় মাদ্রিদের ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাসকাল (Maricarmen Abascal)-এর উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে। যে বাড়িতে তিনি প্রায় ৭০ বছর বসবাস করেছিলেন, সেখান থেকে তাকে উচ্ছেদ করার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদের জন্ম দেয়।
অর্থাৎ, সানচেজ সরকারের কাছে আবাসন আইন দুটি ছিল শুধু আরেকটি আইন নয়, এটি ছিল সাধারণ মানুষের সবচেয়ে স্পর্শকাতর একটি সমস্যায় সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান দেখানোর গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
তাহলে বিলটি আটকাল কীভাবে?
আসল রাজনৈতিক নাটক এখানেই। সানচেজের সরকার স্পেন সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল নয়। আর তাই গুরুত্বপূর্ণ কোনো আইন বা ডিক্রি পাস করাতে তাকে অন্য দলের ভোটের ওপর নির্ভর করতে হয়।
২ অক্টোবর কংগ্রেসে সরকারের আবাসন-সংক্রান্ত দুটি ডিক্রি নিয়ে ভোট হয়। শেষ পর্যন্ত পিপি (PP), ভক্স (Vox) এবং কাতালান স্বাধীনতাপন্থী দল জুনৎস (Junts), এই তিন দলই সরকারের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেয়।
ফলে দুটি ডিক্রি কোনটিই কংগ্রেসে টিকতে পারেনি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো জুনৎসের ভোট। কারণ, সানচেজ সরকার সংসদে টিকে থাকতে বিভিন্ন সময় জুনৎস’সহ আঞ্চলিক দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু আবাসন ইস্যুতে জুনৎস সরকারের সঙ্গে একমত হয়নি।
অর্থাৎ, সানচেজ শুধু বিরোধী দল পিপি ও ভক্সের বিরোধিতার মুখে পড়েননি; যে দলগুলোর সমর্থন নিয়ে তিনি সংসদে আইন পাস করানোর চেষ্টা করছিলেন, তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশও এবার পাশে দাঁড়ায়নি।
কিন্তু একটি বিল আটকালেই কি প্রধানমন্ত্রীকে নির্বাচন ডাকতেই হয়?
এর উত্তর হলো- না।
এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
স্পেনের নিয়ম অনুযায়ী, কংগ্রেসে কোনো একটি সরকারি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলেই প্রধানমন্ত্রীকে নির্বাচন ডাকতে হয় না। সরকার চাইলে অন্য আইন নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে পারে, নতুন প্রস্তাব আনতে পারে অথবা সংসদে অন্যভাবে সমর্থন খুঁজতে পারে।
তাহলে প্রশ্ন হলো- সানচেজ কেন নির্বাচন ডাকলেন?
কারণ, ২ অক্টোবরের ভোটটি তার সরকারের জন্য শুধু একটি আইনগত পরাজয় ছিল না, বরং এটি দেখিয়ে দিয়েছে যে সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা জোগাড় করে গুরুত্বপূর্ণ নীতি বাস্তবায়ন করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
সানচেজের সামনে তখন দুটি পথ ছিল। একটি হলো, একই ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সংসদ চালিয়ে যাওয়া, অন্যটি হলো জনগণের কাছে ফিরে গিয়ে নতুন ম্যান্ডেট চাওয়া।
তিনি দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছেন।
স্পেনের সরকারি গেজেট বিওই (BOE)-তে প্রকাশিত রাজকীয় ডিক্রিতে কংগ্রেস ও সিনেট ভেঙে দেওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং ২৯ নভেম্বর নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
তাহলে সানচেজ কি বাধ্য হয়ে নির্বাচন দিয়েছেন?
তিনি বাধ্য হয়েই নির্বাচন দিয়েছেন -বলা ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, তিনি রাজনৈতিকভাবে এমন একটি জায়গায় পৌঁছেছিলেন, যেখানে আগাম নির্বাচন তার কাছে অপেক্ষাকৃত ভালো বিকল্প মনে হয়েছে।
কারণ আবাসন ইস্যুতে সরকার সংসদে পরাজিত হলেও একই সময়ে এই ইস্যুতে রাস্তায় মানুষের ক্ষোভও তীব্র হয়েছে। সানচেজের শিবিরের হিসাব ছিল, আবাসন সংকট নিয়ে মানুষের ক্ষোভকে কেন্দ্র করে একটি নির্বাচনী লড়াই তৈরি করা গেলে তার দল রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতে পারে।
স্প্যানিশ সংবাদ মাধ্যম, কাদেনা চের -এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সানচেজের ঘনিষ্ঠ মহলে এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল যে আবাসনের অধিকার নিয়ে তৈরি হওয়া সামাজিক ক্ষোভ প্রগতিশীল ভোটারদের আবার সক্রিয় করতে পারে এবং এই মুহূর্তটিই নির্বাচনের জন্য তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক হতে পারে।
বরং নির্বাচন না ডাকলে আরো বৃহত্তর গণ আন্দোলনের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
কারণ, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিরোধী পিপি জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছে। ফলে নির্বাচন ডেকে সানচেজ নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারবেন -এর কোনো নিশ্চয়তা নেই।
বিরোধীদের জন্য এটি কেন বড় সুযোগ?
পিপির কাছে কংগ্রেসে সরকারের আবাসন প্রস্তাব ঠেকানো ছিল সানচেজ সরকারের দুর্বলতা তুলে ধরার সুযোগ।
পিপির যুক্তি ছিল, শুধু ভাড়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে আবাসন সংকট সমাধান করা যাবে না; বরং নতুন বাড়ি নির্মাণ বাড়াতে হবে।
অন্যদিকে সানচেজ সরকারের বক্তব্য ছিল, বাজারকে নিয়ন্ত্রণ না করলে সাধারণ মানুষের জন্য বাসস্থান ক্রমেই নাগালের বাইরে চলে যাবে।
অর্থাৎ নির্বাচনে এখন একটি প্রশ্ন খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, সেটা হলো-
স্পেনের আবাসন সংকটের সমাধান কি আরও বাড়ি নির্মাণ, নাকি ভাড়া ও আবাসন বাজারে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ?
এই প্রশ্নটি শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর নয়, দেশের লাখ লাখ ভাড়াটিয়ার দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
নির্বাচন ডাকায় আর কী কী আটকে গেল?
আগাম নির্বাচন ঘোষণার সবচেয়ে বড় প্রভাব শুধু ক্ষমতার লড়াইয়ে নয়, সংসদে চলমান বহু আইনেও পড়েছে।
নির্বাচনের কারণে বাজেটসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আইন ও সংস্কার প্রক্রিয়া থেমে গেছে। এর মধ্যে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলগুলোর অর্থায়ন সংস্কার, স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন উদ্যোগ, তামাকবিরোধী আইন, শিশুদের ডিজিটাল সুরক্ষা এবং আরও বেশ কিছু প্রস্তাব রয়েছে।
ফলে ২ অক্টোবরের সেই ভোটের প্রভাব কেবল দুটি আবাসন ডিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না।
তাহলে এখন বাস্তবতা কোথায়?
এখন বাস্তবতা হলো, সানচেজের সরকার সংসদে সংখ্যালঘু সরকারে পরিণত হয়েছে, যাকে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করাতে সংসদের বিভিন্ন দলের সমর্থন খুঁজতে হয়। আর আবাসন সংকটের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়ে সেই সমর্থন যখন পাওয়া গেল না, তখন সানচেজ বুঝলেন, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়া বাকি মেয়াদ পার করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সেই জায়গা থেকেই তিনি জনগণের কাছে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এখন স্পেনের রাজনীতির মাঠে বড় বিষয় হলো, ২৯ নভেম্বর স্পেনের মানুষ কি সানচেজকে আরও শক্তিশালী ম্যান্ডেট দেবে, নাকি এই ভোটে সরকার পরিবর্তনের পথ খুলে যাবে।
আর নির্বাচন পরবর্তী বিজয়ী সরকার পদক্ষেপ না নেয়া পর্যন্ত বুঝা যাবে না- স্পেনের আবাসননীতি, ভাড়াটিয়াদের অধিকার, অভিবাসন, অর্থনীতি এবং ইউরোপীয় রাজনীতিতে পরবর্তী অধ্যায়ের দিক কোন দিকে যাবে।