ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার অভিবাসন ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও কঠোর ও সমন্বিত করার পথে এগোচ্ছে। বিশেষ করে হঠাৎ করে বিপুলসংখ্যক অভিবাসী সীমান্তে পৌঁছে গেলে কীভাবে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হবে, সীমান্ত নজরদারি কীভাবে বাড়ানো হবে এবং যাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার অধিকার নেই তাদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া কীভাবে দ্রুত করা হবে- এসব বিষয়কে সামনে রেখে ইউরোপীয় কমিশন পাঁচ দফা নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
২৯ সেপ্টেম্বর প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনার পেছনে চলতি গ্রীষ্মে স্পেনের সেউতায় তৈরি হওয়া বড় অভিবাসন সংকট গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করেছে। ইউরোপীয় কমিশন বলছে, সেউতার ঘটনা দেখিয়েছে যে ইইউর বহির্সীমান্তে খুব অল্প সময়ের মধ্যে বড় আকারের অভিবাসী প্রবেশের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এবং এ ধরনের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদ্যমান ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
ইইউর পরিকল্পনায় পাঁচটি প্রধান দিক রয়েছে। প্রথমত, অভিবাসীদের উৎস ও ট্রানজিট দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো। দ্বিতীয়ত, ইইউর বহির্সীমান্ত আরও শক্তিশালী করা। তৃতীয়ত, সীমান্ত পরিস্থিতি সম্পর্কে আগাম সতর্কতা ও নজরদারি বাড়ানো। চতুর্থত, মানবপাচার ও অভিবাসী পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা। পঞ্চমত, যেসব ব্যক্তির ইইউতে থাকার আইনগত অধিকার নেই, তাদের ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা।
স্পেনের জন্য পরিকল্পনাটির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে। নতুন ব্যবস্থায় ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সকে আরও শক্তিশালী করার প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে থাকবে দ্রুত মোতায়েনযোগ্য সদস্য ও সরঞ্জাম, সীমান্ত পর্যবেক্ষণে বাড়তি সক্ষমতা এবং ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে সংস্থাটির বড় ভূমিকা। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার জন্য একটি নতুন ইউরোপীয় জরুরি প্রতিক্রিয়া কাঠামো তৈরির কথাও বলা হয়েছে।
সেউতার মতো স্পেনের বহির্সীমান্ত এলাকায় এর বাস্তব গুরুত্ব রয়েছে। কারণ সেউতা ও মেলিয়া স্পেনের ভূখণ্ড হলেও একই সঙ্গে এগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহির্সীমান্ত। ফলে সেখানে বড় ধরনের অভিবাসন সংকট তৈরি হলে বিষয়টি শুধু স্পেনের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে না; ইইউর সীমান্ত নিরাপত্তার অংশ হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।
চলতি বছরের ৩০ ও ৩১ জুলাই সেউতায় বড় আকারে অনিয়মিত সীমান্ত পারাপারের পর স্পেন ইইউর কাছে অতিরিক্ত সহায়তা চেয়েছিল। এর পর ৯ সেপ্টেম্বর ইউরোপীয় কমিশন স্পেনকে ১১ কোটি ৪৭ লাখ ইউরোর জরুরি সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই অর্থের মধ্যে ৮ কোটি ২৭ লাখ ইউরো এসেছে আশ্রয় ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনা তহবিল থেকে এবং ৩ কোটি ২০ লাখ ইউরো সীমান্ত ও ভিসা ব্যবস্থাপনার তহবিল থেকে।
এই অর্থ দিয়ে সীমান্ত নজরদারি ও নিরাপত্তা অবকাঠামো শক্তিশালী করা, অতিরিক্ত জনবল ও সরঞ্জাম মোতায়েন, অভিবাসীদের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য স্থাপনা তৈরি এবং যাদের সেউতায় থাকার আইনগত অধিকার নেই তাদের ফেরত পাঠানোর কাজে সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে বিশেষ করে অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সেউতার আশ্রয় ও গ্রহণক্ষমতা বাড়ানোর ব্যবস্থাও এর আওতায় রয়েছে।
নতুন ইইউ পরিকল্পনায় শুধু সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর কথা বলা হয়নি। অভিবাসীদের যাত্রাপথ সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইইউর সীমান্ত নজরদারি ব্যবস্থা ইউরোসুরের (EUROSUR) মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোকে সীমান্ত পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দ্রুত জানাতে বলা হচ্ছে। একই সঙ্গে ফ্রন্টেক্সের নজরদারি সক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে, যার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সীমান্ত পরিস্থিতি সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়ার বিষয়টিও রয়েছে।
তবে এই অংশটি ভবিষ্যতে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক তৈরি করতে পারে। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ, অনলাইনে অভিবাসনসংক্রান্ত তথ্য ছড়িয়ে পড়া এবং ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত করার মতো ব্যবস্থাগুলো কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মৌলিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নও রয়েছে। ইইউ পরিকল্পনায় এসব বিষয়ে ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্টের আওতায় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সার্চ ইঞ্জিন ও জাতীয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে মানবপাচারকারী ও অভিবাসী পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা আরও কঠোর করার পরিকল্পনাও রয়েছে। ইইউ চায় পাচারকারীদের সম্পদ জব্দ ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মতো ব্যবস্থা কার্যকর করতে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ডিজিটাল পেমেন্ট সেবাদাতাদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়িয়ে পাচারকারী চক্রের অনলাইন কার্যক্রম এবং অর্থের প্রবাহ শনাক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। ইউরোপীয় পুলিশ সংস্থা ইউরোপোলের অভিবাসী পাচারবিরোধী সক্ষমতা আরও বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হতে পারে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে। ইইউ কমিশন বলছে, যেসব তৃতীয় দেশের নাগরিকের ইইউতে থাকার আইনগত অধিকার নেই, তাদের ফেরত পাঠানোর জন্য সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আরও সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ফ্রন্টেক্সের ভূমিকা বাড়ানো হবে এবং তৃতীয় দেশগুলোর সঙ্গে ফেরত গ্রহণ বা পুনঃভর্তির বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ইইউ একই সঙ্গে নতুন ফেরত-সংক্রান্ত বিধি বাস্তবায়ন এবং সীমান্ত পর্যায়ে ফেরত প্রক্রিয়া ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে। প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে পুরো প্রক্রিয়াকে আরও ডিজিটাল করার কথাও বলা হয়েছে।
স্পেন ইতোমধ্যে এই ধরনের পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মার্লাস্কা এবং অভিবাসনমন্ত্রী এলমা সাইস ইউরোপীয় কমিশনের অভিবাসন ও স্বরাষ্ট্রবিষয়ক কমিশনার ম্যাগনুস ব্রুনারের সঙ্গে বৈঠকে সংকটের সময় ফেরত পাঠানো ও আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আবেদন দ্রুত প্রক্রিয়াকরণের জন্য ইউরোপীয় পর্যায়ে আইনি পরিবর্তনের প্রতি স্পেনের সমর্থনের কথা জানান।
এর অর্থ হলো, সেউতার মতো হঠাৎ বড় আকারের অভিবাসন সংকট তৈরি হলে স্পেন ভবিষ্যতে শুধু নিজস্ব সীমান্তরক্ষী ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবে না। ইইউর ফ্রন্টেক্স, ইউরোপোল এবং ইউরোপীয় আশ্রয় সংস্থার সমন্বিত সহায়তা আরও দ্রুত পাওয়ার কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।
তবে নতুন পরিকল্পনাটি এখনই এমন কোনো আইন নয়, যার সব ব্যবস্থা আগামীকাল থেকেই কার্যকর হয়ে যাচ্ছে। ২৯ সেপ্টেম্বর পরিকল্পনাটি প্রস্তাব করার পর ১ ও ২ অক্টোবর ইইউর বিচার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে তা সদস্য দেশগুলোর সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। এখন কমিশন, সদস্য দেশ এবং সংশ্লিষ্ট ইইউ সংস্থাগুলোকে পরিকল্পনার বিভিন্ন অংশ বাস্তবায়নের জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে।
সেউতা সংকটের কারণে বিষয়টি আরও রাজনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর ইউরোপীয় পার্লামেন্টও সেউতা ও মেলিয়াকে ঘিরে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। পার্লামেন্টের নথিতে বলা হয়েছে, ২৯ থেকে ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ মরক্কো থেকে স্থল ও সমুদ্রপথে সেউতায় অনিয়মিতভাবে প্রবেশ করেছিল বলে তাদের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে; একই সঙ্গে তারা জানিয়েছে যে মৃত্যুর সংখ্যা ও প্রবেশকারীদের সঠিক সংখ্যা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। পার্লামেন্ট ফ্রন্টেক্সের সক্ষমতা বাড়ানো এবং সংকটের সময় দ্রুত মোতায়েনযোগ্য ইউরোপীয় সহায়তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইইউর নতুন পরিকল্পনা শুধু ‘অভিবাসী ঠেকানো’র পরিকল্পনা নয়; এর মধ্যে বৈধ ও নিরাপদ অভিবাসনের পথ তৈরির কথাও রয়েছে। কমিশন বলছে, উৎস দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি তরুণদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থান নিয়ে নতুন উদ্যোগ এবং বৈধ ও নিরাপদভাবে ইউরোপে আসার সুযোগ তৈরির কাজও করা হবে। অর্থাৎ অনিয়মিত অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং বৈধ অভিবাসনের সুযোগ- এই দুই দিককে একই কাঠামোর মধ্যে রাখার চেষ্টা করছে কমিশন।
স্পেনের জন্য এর প্রভাব তাই কয়েকটি স্তরে দেখা যেতে পারে। সীমান্তে নজরদারি ও প্রযুক্তি বাড়বে, সেউতা ও মেলিয়ার মতো এলাকায় ইইউর সহায়তা আরও দৃশ্যমান হতে পারে, অনিয়মিতভাবে প্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া দ্রুত করার চাপ বাড়তে পারে এবং মরক্কোর মতো প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে অভিবাসন সহযোগিতার গুরুত্ব আরও বাড়বে।
একই সঙ্গে স্পেনের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- ইইউ এখন অভিবাসনকে শুধু জাতীয় সীমান্তের সমস্যা হিসেবে দেখছে না। সেউতায় কয়েক দিনের একটি সংকট পুরো ইউরোপীয় সীমান্ত ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে- এই ধারণাই নতুন পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে। ফলে স্পেনের দক্ষিণ সীমান্তে যা ঘটছে, তার সিদ্ধান্ত ও প্রতিক্রিয়া এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ইউরোপীয় পর্যায়ের নীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।