ইতালিতে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে। ইতালিতে নেওয়ার কথা বলে ভুক্তভোগীদের শ্রীলঙ্কা, মিশরসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানো হতো। পরে সেখানে আটকে রেখে চালানো হতো নির্যাতন এবং নারী ভুক্তভোগীদের বাধ্য করা হতো দেহব্যবসায়।
এই চক্রের অন্যতম মূলহোতা মোহাম্মদ আরজু রহমানকে রাজধানীর বনানী থেকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বনানীর সি ব্লক এলাকায় এসআরবি-৪ ও এসআরবি-১-এর যৌথ অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৪-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান।
ইতালির কথা বলে নেওয়া হতো শ্রীলঙ্কা-মিশরে
এসআরবি জানায়, গত ১৬ জুলাই মিশর থেকে কামরুন নাহার ফাতেমা নামে এক ভুক্তভোগী জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি জানান, ইউরোপে নেওয়ার কথা বলে তাকে মিশরে আটকে রাখা হয়েছে এবং সেখানে অমানবিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে।
তদন্তে পাওয়া তথ্য তুলে ধরে এসআরবি জানায়, ফাতেমা ও তাঁর পরিবারের পাঁচ সদস্যকে ইতালিতে নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে আরজু ৮৫ লাখ টাকা নেন। পরে তাদের জানানো হয়, বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ইতালির ভিসা পাওয়া সম্ভব নয়। এ অজুহাতে প্রথমে তাদের শ্রীলঙ্কায় নিয়ে যাওয়া হয়।
শ্রীলঙ্কায় নেওয়ার পর পরিবারটির ওপর নির্যাতন শুরু হলে কোনোভাবে পালিয়ে দেশে ফিরে আসেন তিন পুরুষ সদস্য। তবে আটকা পড়েন ফাতেমা ও আঞ্জুমান আরা নামে দুই নারী।
আঞ্জুমান আরা শ্রীলঙ্কা থেকেই পালিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। অন্যদিকে, ইতালির মিশরীয় দূতাবাস থেকে ভিসা করিয়ে দেওয়ার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ফাতেমাকে মিশরে নিয়ে যাওয়া হয়।
মিশরে নিয়ে ফাতেমার ওপর নির্যাতন
এসআরবির ভাষ্য অনুযায়ী, মিশরে নেওয়ার পর ফাতেমার ওপর শুরু হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। তাকে দেহব্যবসায় বাধ্য করা হয়। এতে রাজি না হওয়ায় শরীরে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়াসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
১২ বছরে পাচার দুই হাজারের বেশি মানুষ
এসআরবি জানায়, গ্রেপ্তার আরজু প্রায় ১২ বছর ধরে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত। এই সময়ে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে দুই হাজারের বেশি মানুষকে বিভিন্ন দেশে পাচার ও বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযানকারীরা জানায়, আরজু ‘আরজু ইমিগ্রেশন লিমিটেড’ ও ‘নাফিস এয়ার ইমিগ্রেশন লিমিটেড’ নাম ব্যবহার করত। তবে তার কোনো বৈধ লাইসেন্স ছিল না বলে জানিয়েছে এসআরবি।
গ্রেপ্তারের সময় তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে পাওয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট পর্যালোচনা করে গত এক বছরে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ টাকার বেশি লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলেও জানানো হয়।
মিশর যাওয়ার আগেই বনানীতে গ্রেপ্তার
এসআরবি জানায়, দীর্ঘদিন মিশরে অবস্থান করা আরজু গ্রেপ্তারের তিন-চার দিন আগে বাংলাদেশে আসে। সম্প্রতি আবার মিশরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিল সে। এনএসআই ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ট্র্যাকিং এবং গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বনানীতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
শ্রীলঙ্কা থেকে পালিয়ে দেশে ফিরে আসা তিন ভুক্তভোগী ইতিমধ্যে ভাটারা থানায় মামলা করেছেন। ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আরজুকে ভাটারা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে দেশের বিভিন্ন থানায়ও তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও অভিযোগ হয়েছে বলে জানিয়েছে এসআরবি।
দুই নারীকে দেশে ফেরানোর চেষ্টা
এসআরবি-৪-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান জানান, শ্রীলঙ্কায় আত্মগোপনে থাকা আঞ্জুমান আরা এবং মিশরে থাকা কামরুন নাহার ফাতেমাকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।