নারীদের যাতায়াত নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে চালু হওয়া বিআরটিসির বিশেষ ‘পিংক বাস’ বা গোলাপি বাস সার্ভিস এখন বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখে। সামাজিক দায়বদ্ধতার এই মহৎ উদ্যোগটি চালুর পর থেকেই তীব্র লোকসানের মুখে পড়েছে, যা টিকিয়ে রাখতে প্রতিদিন গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের ভর্তুকি।
এক নজরে আয়-ব্যয়ের ব্যবধান
বিআরটিসির সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, টিকিট বিক্রি থেকে আসা আয়ের তুলনায় জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচই বহুগুণ বেশি।
- সেপ্টেম্বর চিত্র: ১২ কার্যদিবসে ১৫৮টি ট্রিপে ১৪,১১৬টি টিকিট বিক্রি করে আয় হয়েছে ২ লাখ ২ হাজার ৮ টাকা। অথচ কেবল জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদই ব্যয় হয়েছে ৩ লাখ ৫২ হাজার থেকে ৪ লাখ ২৮ হাজার টাকা।
- আগস্ট চিত্র: আট কার্যদিবসে ১১৪টি ট্রিপ থেকে আয় হয়েছিল মাত্র ৯৮ হাজার ৬৪৬ টাকা, যেখানে জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ছিল এর দ্বিগুণেরও বেশি।
- দৈনিক লোকসান: সারা দেশে নারী বাসসেবায় প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৫০ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে চালক-শ্রমিকদের বেতন, লুব্রিকেন্ট ও প্রশাসনিক খরচ।
লোকসানের নেপথ্যে যে কারণগুলো
- মূল চ্যালেঞ্জ: শুধু জ্বালানি খরচ মেটাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটানো বিআরটিসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
- যাত্রী সংকট ও খালি আসন: ৬০ আসনের প্রতিটি বাসে গড়ে প্রায় ২০টি আসন খালি থাকছে। কাঙ্ক্ষিত যাত্রী না পাওয়ায় আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হচ্ছে না।
- সপ্তাহে দুই দিন বন্ধ: সাধারণ বাস সপ্তাহের সাত দিন চললেও ‘পিংক বাস’ শুক্র ও শনিবার বন্ধ রাখা হয়। কর্তৃপক্ষের দাবি, ছুটির দিনে কর্মজীবী নারী যাত্রী কম থাকে। তবে এতে একদিকে যেমন সেবা ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য আয়ও কমছে।
- জ্বালানির চড়া দাম: ২১ কিলোমিটারের একটি রুটে আসা-যাওয়া মিলিয়ে ৪২ কিলোমিটার চলতে যে পরিমাণ ডিজেল পোড়ে, তার বর্তমান বাজারমূল্য বাজেটকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
উত্তরণের পথ কী বলছে কর্তৃপক্ষ?
বিআরটিসির ব্যবস্থাপক মো. নূর-ই-আলম জানান, বাণিজ্যিক লাভের চেয়ে নারী যাত্রীদের নিরাপত্তা ও আস্থার বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে আর্থিক চাপ কমাতে কিছু পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে।
- ব্রেক-ইভেনের শর্ত: বিআরটিসির হিসাব অনুযায়ী, একটি ট্রিপে যদি অন্তত ১২০ জন যাত্রী পাওয়া যায়, তবেই আয় ও ব্যয়ের হিসাব সমান (ব্রেক-ইভেন) করা সম্ভব।
- সম্প্রসারণ পরিকল্পনা: বাসের সংখ্যা ও ট্রিপ বাড়লে আয় বাড়বে এবং ভর্তুকির চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ১৮ আগস্ট ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় ১৩টি রুটে ১৪টি বাস নিয়ে যাত্রা শুরু করে এই ‘মহিলা বাস সার্ভিস’। এখন দেখার বিষয়, উদ্ভূত আর্থিক ঘাটতি কাটিয়ে এই জনকল্যাণমূলক সেবাটি দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই হয়।