অনেক ভ্রমণকারীর জন্য পাসপোর্টের একটি সিলমোহর শুধু নতুন দেশে প্রবেশের আনুষ্ঠানিক প্রমাণই নয়, বরং এক ধরনের স্মৃতিচিহ্নও বটে। ভিন্ন ভিন্ন দেশের নানা রকমের সিলমোহর ভরা একটি পাসপোর্ট মানে হলো ভ্রমণের রঙিন ইতিহাস। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সেই পাসপোর্ট স্ট্যাম্প ধীরে ধীরে ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে। এই ছোট্ট ভ্রমণ স্মারকটির জায়গা নিচ্ছে ডিজিটাল ব্যবস্থা, যেগুলোকে বলা হচ্ছে দ্রুততর, নিরাপদ ও কার্যকর।
ইউরোপ এতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। আগামী ১২ অক্টোবর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৯টি দেশ ধাপে ধাপে নতুন এন্ট্রি/এক্সিট সিস্টেম চালু করবে, যা শেষ পর্যন্ত পাসপোর্ট স্ট্যাম্পের জায়গা নেবে বায়োমেট্রিক তথ্য। ২০২৬ সালের এপ্রিলের মধ্যে ভ্রমণকারীর মুখের ছবি, আঙুলের ছাপ এবং ডিজিটাল রেকর্ড পুরোপুরি স্ট্যাম্পের কাজ প্রতিস্থাপন করবে। এটিকে আধুনিকায়ন বলা হচ্ছে, তবে অনেক ভ্রমণকারীর কাছে এটি এক যুগের অবসান।
শুধু ইউরোপই নয়—যুক্তরাজ্য এ বছর জানুয়ারিতে তাদের ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন (ETA) চালু করেছে। এর আগেই অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং এবং আর্জেন্টিনা স্ট্যাম্প তুলে দিয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও ধীরে ধীরে স্ট্যাম্প বাদ দিচ্ছে এবং একই সঙ্গে বাড়াচ্ছে ফেসিয়াল রিকগনিশন ও গ্লোবাল এন্ট্রি, টিএসএ প্রি-চেক, ক্লিয়ার প্লাস-এর মতো প্রোগ্রাম। ভ্রমণের জগৎ এখন কাগজবিহীন হয়ে উঠছে।
বাস্তবিক দিক থেকে এটি যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত। ডিজিটাল সিস্টেম জালিয়াতি কমায়, সীমান্ত চেক দ্রুত করে এবং যাত্রীদের চলাফেরা সহজে ট্র্যাক করা যায়। কিন্তু ভ্রমণকারীদের কাছে পাসপোর্ট স্ট্যাম্প ছিল শুধুই কালি নয়—এটি ছিল এক ধরনের স্মারক, সময়ের দলিল এবং অভিযানের প্রমাণ। একগুচ্ছ ফ্যাকাশে স্ট্যাম্পে ভরা পাসপোর্টের পাতা উল্টে দেখা মানেই ছিল ভ্রমণ ডায়েরি ঘাঁটার মতো অভিজ্ঞতা।
এখন সেই অভ্যাস হারিয়ে যাচ্ছে—যেমনটা ঘটেছিল চেক লেখা বা প্রিন্টেড বোর্ডিং পাস বহনের ক্ষেত্রে। আর হ্যাঁ, নিজে থেকে পাসপোর্টে সিল মারা মোটেও উচিত নয় (এটি বেআইনি)। তবে কিছু বিমানবন্দরে স্মারক হিসেবে দর্শনার্থীদের জন্য আলাদা সিল দেওয়া হয়, চাইলে কাস্টমসে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে।
পাসপোর্ট স্ট্যাম্প হয়তো উঠে যাচ্ছে, কিন্তু ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থাকবে আগের মতোই। শুধু সেই স্মৃতিগুলো আর পাতায় মুদ্রিত হবে না।
যেসব দেশে পাসপোর্ট স্ট্যাম্প ধাপে ধাপে বন্ধ হচ্ছে, সে সব দেশগুলো হচ্ছে- অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, বুলগেরিয়া, ক্রোয়েশিয়া, চেকিয়া, ডেনমার্ক, এস্তোনিয়া, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রিস, হাঙ্গেরি, আইসল্যান্ড, ইতালি, লাটভিয়া, লিচেনস্টেইন, লিথুয়ানিয়া, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, রোমানিয়া, স্লোভাকিয়া, স্লোভেনিয়া, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড।