ক্ষমতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় তখন, যখন রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সেই প্রশ্ন যদি সীমান্ত, নিরাপত্তা, কূটনীতি ও সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন বিষয়টি আর কেবল একটি রাজনৈতিক বিতর্ক থাকে না—তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের জবাবদিহি, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার পরীক্ষা।
স্পেনের সেউতা ইস্যুকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক সেই জায়গাতেই নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ২০ মিনুতোস পত্রিকায় প্রকাশিত সাবেক নৌবাহিনী কর্মকর্তা খোয়ান রদ্রিগেস গারাতের একটি মতামত কলাম এই বিতর্ককে আরও বিস্তৃত একটি রাজনৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছে-ক্ষমতা যখন নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা নিজেই নির্ধারণ করতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্রের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকরভাবে সেই ব্যাখ্যাকে যাচাই করতে পারে?
গারাত তাঁর লেখায় ‘দায়মুক্তি’র ধারণাকে সামনে এনেছেন। তাঁর যুক্তি হলো, রাজনৈতিক ক্ষমতার সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ তখনই দেখা দেয়, যখন ক্ষমতাবানরা মনে করতে শুরু করেন যে সিদ্ধান্তের ভুল, বক্তব্যের অসঙ্গতি কিংবা রাজনৈতিক ব্যর্থতার জন্য তাদের বাস্তবে কোনো মূল্য দিতে হবে না।
তাঁর এই বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত হওয়া বা না হওয়া পাঠকের রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করতে পারে। কিন্তু প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ- স্পেনের মতো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত যাচাই কোথায়?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সরকারের হাতে থাকতে পারে না।
সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নিলে বিরোধী দল সেটি প্রশ্ন করবে। সংবাদমাধ্যম তথ্য যাচাই করবে। প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নথি সামনে আনবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজন হলে তদন্ত করবে। আদালত প্রয়োজন হলে আইনি বৈধতা পরীক্ষা করবে। আর নাগরিক সমাজ জানতে চাইবে- রাষ্ট্র যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার ভিত্তি কী?
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই। একই ঘটনার একাধিক রাজনৈতিক ব্যাখ্যা থাকতে পারে, কিন্তু সত্যের একাধিক সংস্করণ থাকতে পারে না। সত্য নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন প্রমাণ, নথি ও স্বাধীন যাচাই।
সেউতা ইস্যুতে বিতর্কটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ঠিক এই জায়গায়।
স্পেনের উত্তর আফ্রিকীয় ভূখণ্ড সেউতা শুধু একটি সীমান্ত এলাকা নয়। এটি স্পেন, মরক্কো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন, নিরাপত্তা ও কূটনীতির সংযোগস্থল। ফলে সেখানে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা দ্রুতই অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রশ্নে পরিণত হতে পারে।
আর সেখানেই রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব তথ্যের দূরত্ব তৈরি হলে সমস্যা আরও জটিল হয়।
একটি সরকার কোনো ঘটনা সম্পর্কে যে ব্যাখ্যা দেবে, সেটি স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সরকারের ব্যাখ্যা আর প্রমাণিত সত্য- এই দুটি বিষয় এক নয়।
এটি শুধু বর্তমান স্পেনের জন্য নয়, যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্যই একটি মৌলিক শিক্ষা।
গারাত তাঁর বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের রাজনৈতিক আচরণকে একই বৃহত্তর ধারণার মধ্যে দেখার চেষ্টা করেছেন। তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক মূল্যায়ন নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু তিনি যে কাঠামোটি ব্যবহার করেছেন, সেটি বিশ্লেষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ- রাজনৈতিক নেতারা যখন নিজেদের বক্তব্যকে বারবার নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেন, তখন নাগরিকের সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় কোনটি রাজনৈতিক বয়ান আর কোনটি যাচাই করা তথ্য, তা আলাদা করা।
এখানে সেউতা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
কারণ সীমান্ত ও নিরাপত্তা নিয়ে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আবেগ খুব দ্রুত রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হতে পারে। অভিবাসন, মরক্কোর সঙ্গে সম্পর্ক, সীমান্ত নিরাপত্তা কিংবা সেউতার ভবিষ্যৎ—প্রতিটি বিষয়ই স্পেনের সাধারণ মানুষের কাছে সংবেদনশীল।
এই সংবেদনশীলতার সুযোগে যদি কোনো রাজনৈতিক পক্ষ তথ্যের পরিবর্তে ভয়, ক্ষোভ বা রাজনৈতিক আনুগত্যকে সামনে নিয়ে আসে, তাহলে গণতান্ত্রিক বিতর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে সরকারও যদি সমালোচনাকে কেবল রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে, তাহলেও একই সমস্যা তৈরি হয়।
কারণ একটি সরকারের সমালোচনা মানেই সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র নয়।
আবার সরকারের কোনো বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তোলাও রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়।
বরং প্রশ্ন করার অধিকারই গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান শক্তি।
এই জায়গায় সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমের কাজ সরকারের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং সরকার কী বলছে, বিরোধীরা কী বলছে এবং বাস্তবে কী ঘটেছে—এই তিনটির মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরা।
সেউতা নিয়ে বিতর্কেও তাই প্রয়োজন আবেগের চেয়ে তথ্যের ওপর জোর।
কোন ঘটনা কখন ঘটেছে?
কী নথি রয়েছে?
কোন সরকারি সংস্থা কী বলেছে?
পুলিশ বা নিরাপত্তা সংস্থার তথ্য কী?
আদালতের পর্যবেক্ষণ আছে কি?
মরক্কোর বক্তব্য কী?
স্পেন সরকারের অবস্থান কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- আগের বক্তব্যের সঙ্গে পরের বক্তব্যের মধ্যে কোনো বাস্তব অসঙ্গতি থাকলে তার ব্যাখ্যা কী?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর রাজনৈতিক স্লোগানে পাওয়া যাবে না। পাওয়া যাবে নথিতে।
এখানেই ‘দায়মুক্তি’র ধারণাটি বাস্তব অর্থ পায়।
দায়মুক্তি মানে শুধু কোনো রাজনীতিকের বিরুদ্ধে মামলা না হওয়া নয়। রাজনৈতিক অর্থে দায়মুক্তি আরও বিস্তৃত। এর অর্থ হলো- একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এমন একটি অবস্থানে পৌঁছে যাওয়া, যেখানে তার বক্তব্যকে যাচাই করার প্রয়োজন কমে যায়, ভুলের ব্যাখ্যা দেওয়ার চাপ কমে যায় এবং রাজনৈতিক ব্যর্থতার দায় অন্য কারও ওপর সরিয়ে দেওয়া সহজ হয়ে যায়।
এ ধরনের পরিস্থিতি কোনো গণতন্ত্রের জন্য স্বাস্থ্যকর নয়।
কারণ গণতন্ত্রে ক্ষমতা স্থায়ী নয়। আজ যে সরকার ক্ষমতায়, আগামী নির্বাচনে সে বিরোধী দলে যেতে পারে। আজ যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত জনপ্রিয়, কয়েক বছর পর সেটিই ভুল বলে প্রমাণিত হতে পারে।
তাই গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি কোনো সরকারের জনপ্রিয়তায় নয়; বরং সরকারের নিজের সিদ্ধান্তের জবাব দেওয়ার সক্ষমতায়।
পেদ্রো সানচেজের সরকারকে ঘিরে সেউতা ও মরক্কো সম্পর্কিত বিতর্কেও এই প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক। সরকারের নীতি সঠিক কি না, তা রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত হতে পারে। কিন্তু সেই নীতির ভিত্তি কী, তার ব্যাখ্যা কী এবং সিদ্ধান্তের ফল কী হয়েছে- এসব প্রশ্নের উত্তর সরকারকে দিতেই হবে।
একইভাবে সরকারের সমালোচকরাও জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারেন না। তারা কোনো অভিযোগ তুললে তার প্রমাণও দিতে হবে।
অর্থাৎ জবাবদিহি শুধু সরকারের জন্য নয়। বিরোধী দল, সংবাদমাধ্যম, নিরাপত্তা সংস্থা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক- সবার ক্ষেত্রেই একই নীতি প্রযোজ্য।
কারণ সত্য কোনো দলের সম্পত্তি নয়।
এখানেই সেউতা ইস্যু স্পেনের বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি আয়না হয়ে উঠতে পারে।
একদিকে সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগ। অন্যদিকে মরক্কোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক। তার সঙ্গে যুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতি। সবকিছুর ওপর আবার রয়েছে স্পেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
এই চারটি স্তর যখন একসঙ্গে কাজ করে, তখন তথ্যের চেয়ে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বেশি জোরালো হয়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে।
আর সেই মুহূর্তেই স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব বেড়ে যায়।
কারণ কোনো প্রধানমন্ত্রীই রাষ্ট্রের সমান নন।
কোনো রাজনৈতিক দলই রাষ্ট্রের মালিক নয়।
কোনো সংবাদমাধ্যমও সত্যের একমাত্র মালিক নয়।
এমনকি কোনো নিরাপত্তা সংস্থার বক্তব্যও প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না।
শেষ পর্যন্ত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সত্য যাচাইয়ের পথ হতে হবে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক, নথিভিত্তিক এবং স্বাধীন।
খোয়ান রদ্রিগেস গারাতের লেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক তাই তাঁর কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অভিযোগ নয়; বরং সেই অভিযোগের মধ্য দিয়ে উঠে আসা বৃহত্তর প্রশ্নটি।
স্পেনে ক্ষমতা কীভাবে জবাবদিহির মুখোমুখি হচ্ছে?
সরকারের বক্তব্য কতটা স্বাধীনভাবে যাচাই হচ্ছে?
রাজনৈতিক বয়ান ও বাস্তব তথ্যের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলে সেটি কে প্রকাশ করছে?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—নাগরিকরা কি পর্যাপ্ত তথ্য পাচ্ছেন, যাতে তারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন?
এই প্রশ্নগুলো কেবল সানচেজ সরকারকে ঘিরে নয়। ভবিষ্যতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, একই প্রশ্ন তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
কারণ গণতন্ত্রে জবাবদিহির নিয়ম ব্যক্তির ওপর নির্ভর করলে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে যায়।
আজ একজন প্রধানমন্ত্রীকে ছাড় দেওয়া হলো, কাল অন্য একজন সেই একই ছাড় চাইবেন। আজ একটি রাজনৈতিক পক্ষ তথ্য যাচাই ছাড়াই দাবি করল, কাল অন্য পক্ষও একই পদ্ধতি অনুসরণ করবে। ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বয়ান সত্যের জায়গা দখল করবে।
তখন গণতন্ত্র থাকবে, নির্বাচন থাকবে, সংসদ থাকবে—কিন্তু নাগরিকের আস্থা কমতে থাকবে।
সেউতা তাই শুধু একটি সীমান্তের গল্প নয়।
এটি স্পেনের রাষ্ট্রক্ষমতা, রাজনৈতিক বয়ান, কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
এই পরীক্ষায় কোনো পক্ষের জয়-পরাজয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- প্রমাণের জয় হচ্ছে কি না।
কারণ ক্ষমতা ভুল করতে পারে। সরকার ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। বিরোধী দলও ভুল করতে পারে। সংবাদমাধ্যমও ভুল করতে পারে।
কিন্তু একটি সুস্থ গণতন্ত্রের পার্থক্য হলো- ভুল হলে সেটি সংশোধনের পথ খোলা থাকে।
প্রশ্ন করার অধিকার থাকে, নথি চাওয়ার অধিকার থাকে, তদন্তের সুযোগ থাকে, আদালতে যাওয়ার সুযোগ থাকে।
আর ক্ষমতাবান ব্যক্তিকেও বলতে হয়- তিনি কেন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সেউতা নিয়ে বর্তমান বিতর্কের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটাই: রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার সীমান্ত রক্ষা করার ক্ষমতায় নয়, নিজের ক্ষমতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানোর সক্ষমতায়।
আর যখন কোনো সরকার, নেতা বা প্রতিষ্ঠান মনে করতে শুরু করে যে তাদের বক্তব্যই শেষ কথা—তখন গণতন্ত্রের জন্য সতর্ক হওয়ার সময় এসে যায়।
কারণ ক্ষমতার প্রকৃত পরীক্ষা তখনই, যখন ক্ষমতাবান মানুষটিও জানেন- তিনি ক্ষমতার শীর্ষে থাকতে পারেন, কিন্তু সত্য ও জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নন।
মিরন নাজমুল : সম্পাদক, প্রবাহ বাংলা
ই-মেইল: [email protected].