রবিউল আউয়াল মাস মুসলিমদের হৃদয়ে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এ মাসের ১২ তারিখকে বিশ্বের বহু মুসলিম মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাত দিবস হিসেবে স্মরণ করেন। তবে একটি বিষয় শুরুতেই স্পষ্ট করা জরুরি: মহানবী (সা.)-এর জন্মতারিখ নিয়ে ঐতিহাসিক ও আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ১২ রবিউল আউয়াল একটি বহুল প্রচলিত মত হলেও এটিকে অকাট্য ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।
যে জন্ম বদলে দিয়েছিল মানবসভ্যতাকে মক্কার কুরাইশ বংশে মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম আনুমানিক ৫৭০ বা ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দে। তাঁর আবির্ভাব ঘটেছিল এমন এক সমাজে, যেখানে শিরক, গোত্রীয় সংঘাত, সামাজিক বৈষম্য ও নানাবিধ নৈতিক অবক্ষয় চরম আকার ধারণ করেছিল। তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে তাওহিদ, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, আমানতদারি ও আখিরাতের জবাবদিহির শিক্ষা দিয়েছেন।
কুরআন মাজিদ মহানবী (সা.)-এর আগমনকে কেবল একটি নির্দিষ্ট জাতি বা ভূখণ্ডের ঘটনা হিসেবে দেখেনি। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি। (সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:১০৭)। অর্থাৎ, তাঁর জীবন ও শিক্ষা মুসলিমদের জন্য শুধু ধর্মীয় আবেগের বিষয় নয়, বরং সমগ্র মানবতার জন্য এক নৈতিক আদর্শ।
কুরআনে আরও বলা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনজুড়েই রয়েছে উত্তম আদর্শ (সূরা আল-আহজাব, ৩৩:২১)। তাই তাঁর জন্মকে স্মরণ করার সবচেয়ে বড় অর্থ হওয়া উচিত তাঁর অনুকরণীয় জীবনকে স্মরণ করা এবং তাঁর আদর্শকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করা।
আল্লাহর ‘উপহার’ কী?
কুরআন আমাদের শেখায়, মহানবী (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য রহমত ও হেদায়াতের বাহক। তাই “আল্লাহ এই দিনে মানবজাতিকে কী উপহার দিতে চেয়েছিলেন?”—এ প্রশ্নের উত্তর কেবল আবেগ দিয়ে নয়, বরং কুরআনের আলোকে খুঁজতে হবে।
সে উপহারটি ছিল হেদায়াত, রহমত এবং একজন পূর্ণাঙ্গ মানব ও রাসুলের জীবনাদর্শ। তাঁর মাধ্যমেই মানুষ জানতে পেরেছে আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক কেমন হবে, পরিবার ও প্রতিবেশীর অধিকার কী, দরিদ্রের প্রতি দায়বদ্ধতা কী, ব্যবসায় সততা কীভাবে বজায় রাখতে হয় এবং ক্ষমতা হাতে পেয়েও কীভাবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হয়। অতএব, ১২ রবিউল আউয়ালের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো: শুধু নবীপ্রেমের মৌখিক দাবি নয়, বরং তাঁর সুন্নাহর পূর্ণ অনুসরণ।
এই দিনের বিশেষ ইবাদত কী?
এখানে একটি বিষয় অনুধাবন করা গুরুত্বপূর্ণ। ১২ রবিউল আউয়াল উপলক্ষে নির্দিষ্ট কোনো নামাজ, বিশেষ রাকাত, নির্দিষ্ট জিকির বা আবশ্যিক কোনো ইবাদতের নির্দেশ কুরআন বা সহিহ হাদিসে পাওয়া যায় না। তাই নির্ভরযোগ্য দলিল ছাড়া কোনো আমলকে “এই দিনের বিশেষ সুন্নাহ” মনে করা সঠিক নয়।
তবে নবীজি (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া, দান-সদকা, নফল ইবাদত, সিরাত আলোচনা এবং সুন্নাহ অনুসরণ নিঃসন্দেহে সওয়াবের কাজ।
বিশেষভাবে প্রতি সোমবার রোজা রাখার একটি সহিহ হাদিস এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সোমবার রোজা রাখার কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “এ দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনেই আমার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে।” (সহিহ মুসলিম)। এই হাদিসটি নির্দেশ করে যে, নিজের জন্মের কথা স্মরণ করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের একটি সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি হলো সোমবার নফল রোজা রাখা।
ঈদে মিলাদুন্নবী বা জন্মদিন পালন কি জায়েজ?
এ বিষয়ে ইসলামিক পণ্ডিত ও আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এক পক্ষ মনে করেন, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন বা প্রথম যুগের নিষ্ঠাবান মুসলিমেরা ১২ রবিউল আউয়ালকে বার্ষিক উৎসব হিসেবে পালন করেননি। তাই এটিকে নির্দিষ্ট ধর্মীয় অনুষ্ঠান বানানোবিদআত। এই মতের অনুসারীরা নবীপ্রেম প্রকাশের জন্য কেবল সুন্নাহসম্মত আমলকেই যথেষ্ট মনে করেন।
অন্যদিকে বহু আলেম ও প্রাতিষ্ঠানিক ফতোয়া বোর্ডের (যেমন মিসরের দারুল ইফতা) মতে, যদি এ উপলক্ষে কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ পাঠ, সিরাত আলোচনা, দোয়া, দান-সদকা ও মানুষকে খাবার খাওয়ানোর মতো বৈধ কাজ করা হয়—এবং এটিকে শরিয়তের কোনো আবশ্যিক ফরজ বিধান মনে না করা হয়—তবে তা প্রিয় নবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের একটি সামাজিক আয়োজন হিসেবে বৈধ।
সুতরাং মতভেদকে উপেক্ষা না করে বস্তুনিষ্ঠভাবে বলা যায়: মিলাদ বা উৎসব পালনের রূপরেখা নিয়ে আলেমদের মধ্যে ভিন্নমত থাকতে পারে; কিন্তু নবী (সা.)-কে ভালোবাসা, তাঁর ওপর দরুদ পাঠ করা, সিরাত জানা এবং সুন্নাহ অনুসরণের আবশ্যকতা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই।
উৎসব বা স্মরণ কীভাবে হওয়া উচিত?
যাঁরা এ দিনটি উপলক্ষে আয়োজন করেন, তাঁদের জন্য সবচেয়ে সুন্দর পদ্ধতি হতে পারে কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ ও সালাম, মহানবীর (সা.) সীরাত আলোচনা, তাঁর চরিত্র ও সুন্নাহ শিক্ষা দেওয়া এবং দরিদ্রদের মধ্যে দান-সদকা ও খাবার বিতরণ করা।
তবে কোনো আয়োজনেই অপচয়, অশ্লীলতা, অনিয়ন্ত্রিত মেলামেশা, অশালীন বিনোদন, অহংকার কিংবা মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা সম্পর্কে শরিয়তবিরোধী কোনো বিশ্বাস রাখা যাবে না।
আজকের মুসলিমদের করণীয় -আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বাহ্যিক উৎসবের চেয়ে আদর্শিক পুনর্জাগরণ। আমরা যদি সত্যি নবীপ্রেমের দাবি করি, তবে মিথ্যা বর্জন করতে হবে, ব্যবসায়িক প্রতারণা বন্ধ করতে হবে, বাবা-মায়ের সেবা করতে হবে, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করতে হবে, এতিম-দরিদ্রের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং ক্ষমা করতে শিখতে হবে। সেই সঙ্গে সালাত ও কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে হবে।
১২ রবিউল আউয়াল তাই কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়; এটি নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রাখার দিন: আমি কি সত্যিই সেই নবীকে অনুসরণ করছি, যাঁর চরিত্রকে আল্লাহ “উত্তম আদর্শ” হিসেবে ঘোষণা করেছেন?
এ দিনে আয়োজন করা বা না করা নিয়ে মতামত ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সেই মতভেদ যেন মুসলিমদের মাঝে কোনো বিভেদ বা শত্রুতা সৃষ্টি না করে। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা থাকলে তাঁর আদর্শকে জীবনে ফিরিয়ে আনাই হবে সবচেয়ে বড় স্মারক।
১২ রবিউল আউয়ালের শ্রেষ্ঠ বার্তা তাই শুধু আনন্দ নয়, আত্মপরিবর্তন; শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, সুন্নাহর অনুসরণ; আর শুধু মুখের দরুদ নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মুহাম্মদী আদর্শের বাস্তব প্রতিফলন।
কলাম লেখক ও গবেষক, [email protected]