‘আমি মরি নাই, আমি এখনো জীবিত।’ সোমবার সকাল থেকে একের পর এক ফোন পেয়ে পরিচিতজন, সহকর্মী ও সাংবাদিকদের এমন কথাই বলতে হয়েছে সাংবাদিক ও লেখক মিজানুর রহমান সোহেলকে। কারণ, ঢাকার একটি অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত প্রেজেন্টেশনে ২০২৪ সালের ৪ জুলাই হবিগঞ্জে শহীদ সাংবাদিক সোহেল আখন্জির পরিচয়ের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে মিজানুর রহমান সোহেলের ছবি।
ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক ও সাংবাদিক মহলে প্রশ্ন তৈরি হওয়ার পর মিজানুর রহমান সোহেল নিজেই বিষয়টি প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে ভুলের জন্য দুঃখপ্রকাশ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির মিডিয়া, ব্র্যান্ডিং ও প্রচার বিষয়ক উপকমিটি।
কী ঘটেছিল অনুষ্ঠানে?
সোমবার ঢাকার হোটেল ওয়েস্টিনে ডেমোক্রেটিক জার্নালিস্ট এলায়েন্সের (ডিজেএ) আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় ‘সাংবাদিকের চোখে জুলাই’ শীর্ষক স্মৃতিচারণা অনুষ্ঠান।
আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা ও ভূমিকা তুলে ধরাই ছিল অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম, এমপি।
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রদর্শিত একটি তথ্যচিত্রে হবিগঞ্জের সাংবাদিক সোহেল আখন্জির প্রসঙ্গ আসে। কিন্তু সেখানে তাঁর নাম ও পরিচয়ের সঙ্গে ব্যবহার করা হয় সাংবাদিক মিজানুর রহমান সোহেলের ছবি।
ফলে উপস্থাপনায় এমন একটি বিভ্রান্তিকর তথ্য তৈরি হয়, যাতে মনে হয় মিজানুর রহমান সোহেলই ২০২৪ সালের ৪ জুলাই হবিগঞ্জে নিহত বা শহীদ হয়েছেন।
‘আমি হবিগঞ্জে মারা যাইনি’
ঘটনাটি জানার পর বিস্ময় প্রকাশ করেছেন মিজানুর রহমান সোহেল।
তাঁর বক্তব্য, প্রথমে তিনি বিষয়টিকে খুব বেশি গুরুত্ব দেননি। কিন্তু অনুষ্ঠানস্থল থেকে একের পর এক সাংবাদিক ফোন করে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করতে চাইলে বিষয়টি গুরুতর বলে মনে হয়।
নিজের বক্তব্যে তিনি বলেন, তিনি জুলাই আন্দোলনে শহীদ হননি, ২০২৪ সালের ৪ জুলাই হবিগঞ্জেও মারা যাননি। তিনি জীবিত আছেন, এখনো লিখছেন এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
তাঁর প্রশ্ন, একজন জীবিত সাংবাদিককে মৃত বা শহীদ হিসেবে উপস্থাপন করার মতো গুরুতর ভুল কীভাবে একটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানের প্রেজেন্টেশনে জায়গা পেল?
‘ভেরিফিকেশন কি এতটাই কঠিন ছিল?’
মিজানুর রহমান সোহেলের মূল প্রশ্নটি শুধু ভুল ছবির ব্যবহার নিয়ে নয়; বরং তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়েও।
তিনি জানতে চেয়েছেন—তথ্য সংগ্রহ করেছেন কারা, নাম ও ছবি মিলিয়েছেন কারা, প্রেজেন্টেশন তৈরি করেছেন কারা, সেটি যাচাই করেছেন কারা এবং সর্বশেষ কার অনুমোদনের পর সেটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে প্রদর্শন করা হয়েছে।
বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের মতো সংবেদনশীল একটি বিষয়ে তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন ছিল বলেও তিনি মনে করেন।
তাঁর বক্তব্যের সারকথা—একজন ব্যক্তির নাম, ছবি ও মৃত্যুর তথ্য একই সঙ্গে প্রকাশের আগে অন্তত তাঁর পরিচয় ও বর্তমান অবস্থান যাচাই করা সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগের মৌলিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
ভুলের সামাজিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ
মিজানুর রহমান সোহেল মনে করেন, এমন ভুল কেবল একটি অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তথ্যটি যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তাঁর পরিচিতজন বা পরিবারের সদস্যদের কাছে বিভ্রান্তিকর তথ্য পৌঁছাতে পারে।
এমনকি কেউ যদি সত্যতা যাচাই না করেই তাঁর মৃত্যুর খবর প্রচার করেন, তাহলে সেটি তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত পরিচয়ের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
একজন সাংবাদিকের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সংবাদকর্মীর পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতা তাঁর পরিচয় ও তথ্যের নির্ভুলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
এনসিপির ব্যাখ্যা: ‘একান্তই ভুলবশত’
ঘটনাটি নিয়ে অবশ্য দায় এড়িয়ে যায়নি এনসিপি। দলটির মিডিয়া, ব্র্যান্ডিং ও প্রচার বিষয়ক উপকমিটির পক্ষ থেকে দেওয়া দুঃখপ্রকাশে বলা হয়েছে, ডেমোক্রেটিক জার্নালিস্ট এলায়েন্স আয়োজিত ‘সাংবাদিকের চোখে জুলাই’ অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রদর্শিত তথ্যচিত্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হবিগঞ্জের সাংবাদিক সোহেল আখন্জির বর্ণনার সময় ভুলক্রমে সাংবাদিক মিজানুর রহমান সোহেলের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।
এনসিপির পক্ষ থেকে এটিকে ‘একান্তই ভুলবশত’ ঘটে যাওয়া ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
দুঃখপ্রকাশে আরও বলা হয়, দেশের অনলাইন ও ডিজিটাল সাংবাদিকতার জগতে মিজানুর রহমান সোহেল একটি সুপরিচিত নাম। এই ভুলের জন্য তাঁরসহ সংশ্লিষ্ট সবার কাছে দুঃখপ্রকাশ করা হয়েছে এবং বিষয়টিকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
https://www.facebook.com/share/p/17zrcvvg1n/
প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে
এনসিপির দুঃখপ্রকাশের ফলে ভুলের বিষয়ে দলটির অবস্থান স্পষ্ট হলেও ঘটনাটি সাংবাদিকতার একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব কোথায় শেষ হয়?
একজন মৃত ব্যক্তির নামের সঙ্গে জীবিত ব্যক্তির ছবি যুক্ত হওয়া সাধারণ বানান বা টাইপিং ভুলের পর্যায়ে পড়ে না। এখানে নাম, ছবি, পরিচয় এবং মৃত্যুর তথ্য—একাধিক স্তরে অসঙ্গতি তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে কোনো ঐতিহাসিক বা রাজনৈতিক আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত তথ্যচিত্রের ক্ষেত্রে তথ্যের উৎস, ছবি ও পরিচয় যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একটি ভুল ছবি শুধু একজন ব্যক্তিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে না; একই সঙ্গে প্রকৃত ব্যক্তির পরিচয়ও আড়াল করে দিতে পারে।
‘আমি কাউকে অভিযুক্ত করতে চাই না, দায়িত্বশীল ব্যাখ্যা চাই’
মিজানুর রহমান সোহেল তাঁর বক্তব্যে কাউকে অযথা অভিযুক্ত করতে চাননি বলে জানিয়েছেন। বরং তিনি চেয়েছেন ভুলটির বিষয়ে দায়িত্বশীল ব্যাখ্যা এবং যথাযথ সংশোধন।
ঘটনার পর এনসিপির পক্ষ থেকে দুঃখপ্রকাশ আসায় তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে তথ্য সংগ্রহ, ছবি নির্বাচন, সম্পাদনা ও চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রতিটি ধাপে যাচাই ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন কি না—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ভুল ছবি, বড় শিক্ষা
সাংবাদিকদের সাহস ও আত্মত্যাগকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে এমন ভুল নিঃসন্দেহে বিব্রতকর। একই সঙ্গে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাও সামনে আনে—সত্য তুলে ধরার অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত প্রতিটি তথ্যের সত্যতা যাচাই করাও সত্য সাংবাদিকতারই অংশ।
মিজানুর রহমান সোহেলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অস্বাভাবিক বিষয় হলো, নিজের জীবিত থাকার প্রমাণ দিতে তাঁকেই শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে বলতে হয়েছে—‘আমি মরি নাই।’
এনসিপির দুঃখপ্রকাশ ভুলটির তাৎক্ষণিক ব্যাখ্যা দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, এই ভুল কীভাবে ঘটল এবং ভবিষ্যতে এমন ভুল যেন আর কোনো জীবিত মানুষকে ‘মৃত’ কিংবা কোনো প্রকৃত শহীদের পরিচয়কে অন্য কারও ছবির সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলে—তার জন্য কী ধরনের যাচাই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।