রাজধানী ঢাকার সড়কগুলোতে দীর্ঘদিনের জটলা, বেপরোয়া গতি আর ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা বন্ধে আরও কঠোর অবস্থানে নেমেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ও সাধারণ মানুষের যাতায়াত নিরাপদ করতে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে মাত্র একদিনেই তিন হাজারের বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ডিএমপির দেওয়া সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বুধবার দিনভর ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও সড়কে অভিযান চালিয়ে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মোট ৩,১৭২টি মামলা রুজু করা হয়। ট্রাফিক আইন অমান্যকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে এই চিরুনি অভিযানে বিপুল সংখ্যক গণপরিবহন, পণ্যবাহী যান এবং ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। মামলা দায়েরের পাশাপাশি আইন ভঙ্গকারী ৭১৫টি গাড়িকে পাঠানো হয়েছে ডাম্পিংয়ে এবং আরও ১৮৬টি যানকে রেকার করা হয়েছে।
ডিএমপির আটটি ট্রাফিক বিভাগের সমন্বিত এই অভিযানে নগরের মূল সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিতে অবস্থান নেওয়া ট্রাফিক সার্জেন্ট ও পুলিশ সদস্যরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। प्राप्त পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মিরপুর ও ওয়ারী অঞ্চলে ট্রাফিক আইন ভাঙার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে। নিচে বিভিন্ন বিভাগে চালুকৃত মামলা ও আটক যানবাহনের সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো।
অভিযানের সবচেয়ে বড় ধাক্কা দেখা গেছে মিরপুর অঞ্চলে। বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, সিএনজি ও বিপুল সংখ্যক মোটরসাইকেলসহ এই বিভাগে সর্বোচ্চ ৯৪৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে কেবল মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধেই মামলা হয়েছে ৪৫০টি। পুরান ঢাকা ও এর আশপাশের সড়কগুলোতে ট্রাফিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭১৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। বাস, ট্রাক ও সিএনজি চালকদের নিয়ম ভঙ্গের দায়ে এই বিভাগে বড় অংকের মামলা হয়।
উত্তর ঢাকার অন্যতম প্রবেশদ্বার উত্তরা এলাকায় সিগন্যাল অমান্য, উল্টো পথে গাড়ি চালানো ও হেলমেটহীন মোটরসাইকেল চালানোর দায়ে ৪০১টি মামলা হয়েছে। বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলে গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা রুখতে ট্রাফিক পুলিশের অভিযানে ৩১৯টি মামলা দায়ের করা হয়। যানজটপ্রবণ তেজগাঁও ও ফার্মগেট এলাকায় ট্রাফিক আইনে মামলা হয়েছে ২৫৬টি। অভিজাত এলাকা গুলশানেও আইনের ব্যতিক্রম ঘটেনি। ট্রাফিক বিধিমালা ভঙ্গের অপরাধে সেখানে ২১৬টি মামলা ঠোকা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকার লালবাগ অঞ্চলে পরিচালিত অভিযানে মোট ১৮০টি মামলা রুজু করা হয়। তুলনামূলকভাবে রমনা এলাকায় ট্রাফিক শৃঙ্খলা সচেতনতা কিছুটা ইতিবাচক হলেও আইন অমান্যের কারণে ১৪০টি মামলা হয়েছে।
আইন অমান্যকারী যানবাহনের ধরণ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, সড়কে অনিয়মের শীর্ষে রয়েছে দুই চাকার যান মোটরসাইকেল এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানো বাস।
বিভিন্ন বিভাগের ট্রাফিক মামলাগুলোর বিভাগভিত্তিক এবং যানবাহনভিত্তিক পরিসংখ্যান নিচে দেওয়া হলো। মিরপুর বিভাগে বাসের বিরুদ্ধে ১২৪টি, ট্রাকের বিরুদ্ধে ৪০টি, কাভার্ডভ্যানের বিরুদ্ধে ৮০টি, সিএনজির বিরুদ্ধে ৭৮টি এবং মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে ৪৫০টি মামলাসহ সর্বমোট ৯৪৬টি মামলা হয়েছে। ওয়ারী বিভাগে বাসের বিরুদ্ধে ১০২টি, ট্রাকের বিরুদ্ধে ৭৫টি, কাভার্ডভ্যানের বিরুদ্ধে ৬৭টি, সিএনজির বিরুদ্ধে ১১২টি এবং মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে ১৮৩টি মামলাসহ সর্বমোট ৭১৪টি মামলা হয়েছে। উত্তরা বিভাগে বাসের বিরুদ্ধে ৮০টি, ট্রাকের বিরুদ্ধে ২১টি, কাভার্ডভ্যানের বিরুদ্ধে ২১টি, সিএনজির বিরুদ্ধে ৬৬টি এবং মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে ১০৬টি মামলাসহ সর্বমোট ৪০১টি মামলা হয়েছে। মতিঝিল বিভাগে বাসের বিরুদ্ধে ৪০টি, ট্রাকের বিরুদ্ধে ১৬টি, কাভার্ডভ্যানের বিরুদ্ধে ৬৫টি, সিএনজির বিরুদ্ধে ১৪৪টি এবং মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে ৫৪টি মামলাসহ সর্বমোট ৩১৯টি মামলা হয়েছে। তেজগাঁও বিভাগে বাসের বিরুদ্ধে ২৩টি, ট্রাকের বিরুদ্ধে ৩টি, কাভার্ডভ্যানের বিরুদ্ধে ১৭টি, সিএনজির বিরুদ্ধে ৪৩টি এবং মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে ১০৩টি মামলাসহ সর্বমোট ২৫৬টি মামলা হয়েছে। গুলশান বিভাগে বাসের বিরুদ্ধে ১২টি, ট্রাকের বিরুদ্ধে ৫টি, কাভার্ডভ্যানের বিরুদ্ধে ১২টি, সিএনজির বিরুদ্ধে ২৫টি এবং মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে ৭৯টি মামলাসহ সর্বমোট ২১৬টি মামলা হয়েছে। লালবাগ বিভাগে বাসের বিরুদ্ধে ১০টি, ট্রাকের বিরুদ্ধে ১২টি, কাভার্ডভ্যানের বিরুদ্ধে ৬টি, সিএনজির বিরুদ্ধে ২৮টি এবং মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে ১০৩টি মামলাসহ সর্বমোট ১৮০টি মামলা হয়েছে। রমনা বিভাগে বাসের বিরুদ্ধে ১০টি, ট্রাকের বিরুদ্ধে ১টি, কাভার্ডভ্যানের বিরুদ্ধে ৮টি, সিএনজির বিরুদ্ধে ১৩টি এবং মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে ৫৬টি মামলাসহ সর্বমোট ১৪০টি মামলা হয়েছে।
আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং উপযুক্ত কাগজপত্র না থাকায় ৭১৫টি যানবাহন ডাম্পিং করা হয়েছে এবং পথচলতি চলাচলে বাধা সৃষ্টিকারী ১৮৬টি যানকে রেকার দিয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ডিএমপি সূত্র জানায়, নিয়মিত মামলার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, উল্টো পথে দ্রুতগতিতে যান চালানো, রুট পারমিট ও ফিটনেসবিহীন বাস চালানো এবং চালকদের মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স। বিশেষ করে রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে বাস থামিয়ে অবৈধভাবে যাত্রী তোলার প্রবণতা যানজট বাড়ানোর প্রধান কারণ হওয়ায় গণপরিবহনগুলোর ওপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, মেগাসিটি ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আধুনিক ও সুশৃঙ্খল করতে আইন প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। আইন অমান্যকারী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, কাউকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। চালক ও মালিকদের ইতিবাচক মানসিকতা এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে না উঠলে কেবল জরিমানা করে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
নগরবাসীর একটি বড় অংশ ট্রাফিক পুলিশের এই কঠোর পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। দৈনন্দিন যাতায়াতে যারা ট্রাফিক জ্যামের ভোগান্তিতে পড়েন, তাদের মতে, উল্টো পথে গাড়ি চালানো এবং মোড়গুলোতে যত্রতত্র বাস দাঁড়িয়ে থাকার কারণেই মূলত কৃত্রিম যানজট তৈরি হয়। তবে নিয়মিত এই ধরনের অভিযান পরিচালিত হলে চালকদের মধ্যে আইন মানার ভয় ও প্রবণতা বাড়বে।
একইসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল মামলার সংখ্যা বাড়ানোই শেষ কথা নয়, ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ডিজিটাল সিগন্যাল ব্যবস্থার সঠিক বাস্তবায়ন এবং পথচারীদের ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করাও সমান জরুরি।
ডিএমপির পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, রাজধানী জুড়ে এই ট্রাফিক শৃঙ্খলা অভিযান কোনো সাময়িক পদক্ষেপ নয়। ঢাকা মহানগরীর সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগের এই ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। চালক, পথচারী ও পরিবহন মালিক সবাইকে ট্রাফিক আইন মেনে চলে পুলিশকে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছে ডিএমপি।