যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও ৩০ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে তাদের বহনকারী একটি বিশেষ ভাড়া করা উড়োজাহাজ ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। যাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে তাদের হাতে হাতকড়া ও পায়ে শিকল বাধা ছিলো।
বিমানবন্দরের মুখপাত্র ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মাসুদ জানান, রাত সাড়ে ১১টার দিকে চার্টার্ড ফ্লাইটটি অবতরণ করে। ফেরত আসাদের মধ্যে একজন নারীও রয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী কর্মকর্তাদের মতে, অবতরণের পর প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে উড়োজাহাজটি রানওয়েতে ছিল। এ সময় যাত্রীদের হাতকড়া ও শিকল খোলা হয়। পরে রাত ২টার দিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাদের টার্মিনালের ভেতরে আনা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ টিম, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিকরা ছবি তুলতে চাইলে বাধার মুখে পড়েন।
ব্র্যাকের পক্ষ থেকে প্রত্যাবাসিতদের নিজ বাড়িতে পৌঁছাতে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দীর্ঘ যাত্রা ও শিকলে বাঁধা থাকার কারণে তাদের শারীরিক অবস্থা ছিল ভগ্ন।
নোয়াখালীর ২২ বছর বয়সী যুবক আব্দুল্লাহ বলেন, “এত দীর্ঘ যাত্রায় আসামির মতো হাত-পায়ে শিকল বেঁধে রাখা হয়েছিল। দেশের মাটিতে ফেরার কষ্টের সঙ্গে এই অবমাননাকর অভিজ্ঞতা যেন আর কারও জীবনে না আসে।”
শিকলে বাঁধা প্রত্যাবাসন:
ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর অভিযান আরও কঠোর হয়েছে। গত কয়েক মাসেই অন্তত ১৮০ জন বাংলাদেশিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। প্রথমদিকে শিকল ব্যবহার না করা হলেও চলতি বছরের ২ আগস্ট এক নারীসহ ৩৯ জনকে সি-১৭ সামরিক উড়োজাহাজে দেশে ফেরত পাঠানো হয়—তাদের সবার হাত-পায়ে শিকল ছিল। সর্বশেষ ফ্লাইটেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।
ফেরত আসা অনেকেই জানিয়েছেন, প্রায় ৬০ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রার প্রতিটি মুহূর্ত শিকলে বাঁধা অবস্থায় কাটাতে হয়েছে। খাবার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল কেবল রুটি ও পানি। এমনকি টয়লেটে যাওয়ার সময়ও অফিসাররা পাহারা দিতেন এবং পরে আবার শিকল বেঁধে সিটে বসিয়ে দেওয়া হতো।
মানবপাচারের অভিযোগ:
প্রত্যাবাসিতদের একাংশ দাবি করেছেন, তারা মানবপাচারকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন। অন্তত ছয় জন জানান, মেক্সিকোতে মাফিয়ার হাতে জিম্মি হয়ে পরিবারের কাছ থেকে ৪০–৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ আদায় করা হয়। কেউ কেউ জানিয়েছেন, পুরো সম্পদ বিক্রি করেও ৭৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে বাধ্য হয়েছেন।
মানবাধিকার প্রশ্নে বিতর্ক:
২০১৬ সালেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত আসা ২৭ জন বাংলাদেশির ক্ষেত্রে একইভাবে শিকল পরানো হয়েছিল, যা সে সময় তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সাধারণ অভিবাসন প্রত্যাশীদের শিকলে বেঁধে পাঠানো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের পরিপন্থী।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বলেন,
“মানুষ ভালো জীবনের আশায় বিদেশে যায়, কিন্তু অনেকে পাচারের শিকার হয়। বৈধ কাগজপত্র না থাকলে প্রত্যাবাসন আইনগত বিষয়। তবে যেভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাতকড়া ও শিকল বেঁধে পাঠানো হচ্ছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও মানসিকভাবে আঘাতজনক। আমরা আশা করি ভবিষ্যতে এই প্রক্রিয়া আরও মানবিক হবে।”