ঠিক দুই বছর আগের কথা। হঠাৎ একটি অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলো। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে এক ব্যক্তির হাউমাউ করে কান্নার আওয়াজ।
আমি কিছুটা থতমত খেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কে? কাঁদছেন কেন? উত্তরে ওপাশ থেকে ভাঙা গলায় ভেসে এলো, “আমার নাম আবুল কাসেম। বাড়ি কিশোরগঞ্জ, এখন মিশরের আশরা রামাদান থেকে বলছি। অনেক চেষ্টা করে আপনার নম্বরটা পেয়েছি ভাই। আল্লাহর দোহাই লাগে, আমাদের বাঁচান!”
উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইলাম, আসলে কী হয়েছে?
তিনি যা জানালেন, তা রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। আবুল কাসেম কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলার সরারচর ইউনিয়ন পরিষদে চাকরি করতেন। একই জেলার নিকলী উপজেলার কারপাশা ইউনিয়ন পরিষদে কর্মরত ছিলেন মোহাম্মদ শরীফ মিয়া। এই শরীফ মিয়া ও তার স্ত্রী ফুলনাহার বেগম, বাজিতপুরের আবুল কাসেম এবং কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোক্তা মোঃ জামান মিয়া—এই চারজনকে ইতালি পাঠানোর টোপ দেয় এক দালাল চক্র।
মিশরে বসবাসরত কারপাশা জালালপুর গ্রামের জহির মিয়া ও মিনা বেগম নামের এক দালাল দম্পতি তাদের ইতালি পাঠানোর মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে মিশরে নিয়ে আসে। কিন্তু মিশরে নামার পর থেকেই বদলে যায় দৃশ্যপট। দীর্ঘ তিন মাস ধরে একটি অন্ধকার ঘরে তাদের বন্দি করে রাখা হয়।
সবচেয়ে জঘন্য বিষয় হলো, শরীফ মিয়ার স্ত্রী ফুলনাহার বেগমকে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার কথা বলে আনা হলেও, তাকে দিয়ে ওই দালালের বাসায় জোরপূর্বক গৃহকর্মীর কাজ করানো হচ্ছিল।
ফোনে কাসেম আকুতি জানালেন, “আমরা ৪ জন এখানে নরকযন্ত্রণা ভোগ করছি। আমাদের দেশে ফিরতে সাহায্য করুন।
আমি তাদের বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিলে কাসেম জানান, তাদের কাছে দূতাবাসের কোনো নম্বর নেই। এমনকি নিজেদের মোবাইল ফোনটিও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। অত্যন্ত গোপনে অন্য একজনের ফোন থেকে সুযোগ পেয়ে তিনি আমাকে এই কলটি করেছেন। এরপর দালালের নাম ও ফোন নম্বরটি দিয়ে তিনি দ্রুত লাইন কেটে দেন।
কিছুক্ষণ পর আমার হোয়াটসঅ্যাপে বাংলাদেশ থেকে ওই দালালের পাসপোর্টের কপি, ছবি, ফেসবুক আইডি এবং ভুক্তভোগীদের পাঠানো দুটি ভিডিও আসে। ভিডিওগুলোতে তাদের অমানবিক ও অসহায় জীবনের করুণ চিত্র দেখে চোখ ভিজে আসছিল।
দালালের মুখোমুখি: সেদিনই রাতে আমি সরাসরি ওই দালালকে ফোন করি। তিনজনের নাম উল্লেখ করে জানতে চাই, “এদের চেনেন? প্রথমে সম্পূর্ণ অস্বীকার করলেও জেরার মুখে একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন, “হ্যাঁ, আমি এনেছি। ওদের গার্মেন্টসে চাকরি দিয়েছি। এরপর আর কথা না বাড়িয়ে উল্টো আমাকে ধমক দিয়ে ফোন কেটে দেন। পরবর্তীতে বহুবার চেষ্টা করেও তাকে আর ফোনে পাওয়া যায়নি। পরদিন সকালে আমি বিষয়টি মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসের তৎকালীন শ্রম কাউন্সিলর জনাব ইসমাইল হোসেনকে জানাই এবং প্রমাণসহ দালালের নম্বর দিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করি।
দূতাবাস থেকে কাসেমের সাথে যোগাযোগ করে তাদের অফিসে আসতে বলা হয়। কিন্তু কাসেম জানান, কড়া নজরদারির কারণে তিনি আসতে পারছেন না, তবে তার স্ত্রীকে পাঠাবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, দালালের ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে তার স্ত্রী শ্রম কাউন্সিলরের সামনে গিয়ে ঘটনার সমস্ত কিছু অস্বীকার করেন।
হুমকি ও সামাজিক মাধ্যমে লড়াই- পরিস্থিতি জটিল দেখে আমি কিশোরগঞ্জের স্থানীয় কয়েকটি ফেসবুক গ্রুপে দালালের ছবি ও ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে একটি পোস্ট করি। মুহূর্তেই পোস্টটি ভাইরাল হয়ে যায় এবং পক্ষে-বিপক্ষে নানা মন্তব্য আসতে শুরু করে। একপর্যায়ে স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতা আমাকে ফোন করে পোস্টটি মুছে ফেলার জন্য হুমকিও দেন। কিন্তু সত্যের পক্ষে থাকায় আমি পোস্টটি সরাইনি।
এর পরদিনই নাটকীয় মোড় নেয় ঘটনাটি। দালালের ফোন থেকেই কাসেম আমাকে কল করে হাপাচ্ছেন। বললেন, “স্যার, দালাল আমাদের আগামীকালই দেশে পাঠিয়ে দেবে বলেছে। আপনি দয়া করে ফেসবুকের পোস্টটি ডিলিট করে দিন।”
বুঝতে পারলাম, সামাজিক মাধ্যমের চাপ এবং দূতাবাসের তৎপরতায় দালাল চক্র ভয় পেয়ে গেছে।
পরদিন বিমানবন্দর থেকে কাসেম আবার ফোন করলেন। আবেগপ্লুত গলায় বললেন, “স্যার, আমরা বিমানে উঠছি। দেশে ফিরে যাচ্ছি। আপনার উসিলায় আমরা নতুন জীবন পেলাম। আপনি দেশে আসলে শুধু একবার দেখা করে সালাম করতে চাই।
ইতি কথা: কয়েক মাস পর আমি যখন বাংলাদেশে যাই, কাসেম মেসেঞ্জারে বারবার দেখা করার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু সময়ের তীব্র স্বল্পতায় আমার আর তার সাথে দেখা করা হয়ে ওঠেনি।।আজ হঠাৎ ফেসবুকে কাসেম ও তার পরিবারের হাসিমুখের একটি ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠল। আর তাতেই মনে পড়ে গেল দুই বছর আগের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা। মনে হলো, এই গল্পটি আবারও সবাইকে জানানো উচিত।।বিদেশে সুন্দর ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন দেখিয়ে এই মানব পাচারকারীরা আজও অসংখ্য নিরীহ মানুষকে প্রতারণার জালে ফেলছে। অনেকেই হারাচ্ছেন তাদের সারাজীবনের সঞ্চয়, সম্মান, স্বাধীনতা-এমনকি নিজের মূল্যবান জীবনও।
সতর্কবার্তা: প্রবাসে যাওয়ার আগে কোনো দালালের খপ্পরে না পড়ে, সবসময় সরকারিভাবে অনুমোদিত ও বৈধ পথ বেছে নিন। মনে রাখবেন, আপনার একটি অসচেতন সিদ্ধান্ত শুধু আপনার নয়, একটি পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ চিরতরে অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে।