বিবিসির গোপন অনুসন্ধানে জানা গেছে, যুক্তরাজ্যে কিছু আইন পরামর্শদাতা ও কথিত আইনি সহায়তাকারী অভিবাসীদের মিথ্যা সমকামী পরিচয় দিয়ে আশ্রয় আবেদন করতে সাহায্য করছে। তারা হাজার হাজার পাউন্ডের বিনিময়ে মানুষকে শেখাচ্ছে কীভাবে নিজেকে সমকামী দাবি করতে হবে, কীভাবে বানানো গল্প মুখস্থ করতে হবে, এবং কীভাবে ভুয়া প্রমাণ তৈরি করতে হবে—যেমন সমর্থনপত্র, ছবি, এমনকি চিকিৎসা সংক্রান্ত নথিও।
এই পদ্ধতিতে অনেক অভিবাসী, বিশেষ করে যাদের ছাত্র, কাজ বা ভিজিট ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে, তারা দাবি করছে যে তারা সমকামী এবং নিজ দেশে ফিরে গেলে প্রাণহানির ঝুঁকিতে পড়বে। বিশেষ করে পাকিস্তান ও বাংলাদেশে সমকামিতা সামাজিক ও আইনি সমস্যার কারণ হওয়ায় এই যুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে আশ্রয়ের আবেদন করার জন্য।
বিবিসির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একজন আইন ফার্মের সঙ্গে যুক্ত উপদেষ্টা ৭,০০০ পাউন্ড পর্যন্ত ফি নিয়ে ভুয়া আশ্রয় আবেদন তৈরি করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে এবং বলেছে, হোম অফিস আবেদন বাতিল করার সম্ভাবনা খুবই কম। কেউ কেউ জিপির কাছে গিয়ে মিথ্যা বিষণ্নতার অভিনয় করছে, আবার কেউ এইচআইভি আক্রান্ত হওয়ার মিথ্যা দাবি করছে যাতে অতিরিক্ত মেডিকেল প্রমাণ দেখানো যায়।
এক নারী উপদেষ্টা, যিনি ১৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে এ ধরনের কাজ করছেন বলে দাবি করেছেন, বলেছেন তিনি এমন ব্যক্তির ব্যবস্থা করতে পারেন যে আবেদনকারীর সঙ্গে সমকামী সম্পর্কের ভান করবে এবং লিখিতভাবে জানাবে যে তাদের শারীরিক সম্পর্ক ছিল। তিনি আরও বলেছেন, যদি কেউ আশ্রয় পেয়ে যায়, পরে নিজের স্ত্রীকে যুক্তরাজ্যে এনে তাকেও “লেসবিয়ান” পরিচয়ে আশ্রয়ের আবেদন করানো সম্ভব।
এই নারী পরামর্শদাতা ২,৫০০ পাউন্ডের বিনিময়ে পুরো “প্যাকেজ” দেওয়ার কথা বলেন—যার মধ্যে থাকবে এলজিবিটি ক্লাবের ছবি, সমর্থনপত্র, সংগঠনের রেফারেন্স, এবং সাক্ষাৎকারের জন্য গল্প তৈরি করে দেওয়া।
বিবিসির গোপন প্রতিবেদক পূর্ব লন্ডনের এক কমিউনিটি সেন্টারে এমন একটি অনুষ্ঠানে যান যেখানে ১৭৫ জনেরও বেশি মানুষ উপস্থিত ছিল। অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হয়েছিল “Worcester LGBT” নামে একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে, যারা নিজেদের সমকামী ও লেসবিয়ান আশ্রয়প্রার্থীদের সহায়ক দল হিসেবে পরিচয় দেয়। কিন্তু সেখানে উপস্থিত অনেকেই স্বীকার করেছে যে তারা আসলে সমকামী নয়। একজন বলেন, “এখানে বেশিরভাগ মানুষ সমকামী না।” আরেকজন বলেন, “এখানে একজনও আসল সমকামী নেই।”
এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত একজন উপদেষ্টা বলেন, “এখন দেশে থাকার একটাই উপায়—সমকামী কেস করে আশ্রয় চাওয়া। সবাই এটাই করছে।” তিনি আরও বলেন, “তুমি একা নও, অনেকেই সমকামী না হয়েও এইভাবে আবেদন করছে।”
একজন বিশেষজ্ঞ অভিবাসন আইনজীবী বিবিসিকে বলেন, এটি সরাসরি প্রতারণা এবং আইন ভঙ্গের শামিল। তিনি বলেন, এমন কাজ প্রকৃত আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তোলে, কারণ এতে সত্যিকারের নির্যাতিত মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিবিসি আরও জানতে পেরেছে, পাকিস্তানি নাগরিকরা যৌন পরিচয়ের ভিত্তিতে আশ্রয় দাবির ক্ষেত্রে অস্বাভাবিকভাবে বেশি সংখ্যায় আবেদন করছে। ২০২৩ সালে এ ধরনের নতুন আশ্রয় আবেদনের ৪২ শতাংশই ছিল পাকিস্তানিদের পক্ষ থেকে। অথচ সামগ্রিক আশ্রয় আবেদনের মধ্যে পাকিস্তানিদের অংশ মাত্র ৬ শতাংশ।
এক ব্যক্তি, যিনি নিজের নাম গোপন রেখে “আলি” নামে পরিচয় দিয়েছেন, জানান তিনি ২০১১ সালে ছাত্র হিসেবে যুক্তরাজ্যে যান। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে এক আইনজীবী তাকে পরামর্শ দেন মিথ্যা সমকামী পরিচয়ে আশ্রয় চাইতে। তাকে বলা হয় ডাক্তারের কাছে গিয়ে বিষণ্নতার অভিনয় করতে, ওষুধ নিতে, এবং প্রাইড মিছিল ও গে ক্লাবে গিয়ে ছবি তুলতে। শেষ পর্যন্ত বহু টাকা খরচের পরও তার আবেদন ব্যর্থ হয় এবং তিনি দেশে ফিরে যান।
ব্রিটিশ সরকার বলেছে, প্রতারণা করে আশ্রয় আবেদন করা একটি ফৌজদারি অপরাধ। কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তার কারাদণ্ড হতে পারে এবং পরে তাকে দেশ থেকেও বহিষ্কার করা হতে পারে। হোম অফিস জানিয়েছে, যারা আশ্রয় ব্যবস্থার অপব্যবহার করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘটনায় ব্রিটেনের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠনও উদ্বেগ জানিয়েছে। কেউ বলছে জড়িত আইনজীবীদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়া উচিত, কেউ বলছে পুরো আশ্রয় ব্যবস্থা সংস্কার করা দরকার। তবে শরণার্থী সহায়তা সংগঠনগুলো সতর্ক করেছে—কিছু প্রতারণার ঘটনা যেন প্রকৃত নির্যাতিত আশ্রয়প্রার্থীদের প্রতি অবিশ্বাস তৈরির কারণ না হয়।