ইউরোপে ন্যূনতম মজুরি বাড়ালে কর্মসংস্থান কমে যায়—এমন ধারণা দীর্ঘদিন ধরেই প্রচলিত। তবে সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে পর্তুগাল। দেশটি গত চার বছরে ন্যূনতম বেতন প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়ালেও বেকারত্বের হার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিকল্পিত বাস্তবায়ন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে এই সাফল্য অর্জন করেছে দেশটি।
বর্তমানে পর্তুগালের বেকারত্বের হার প্রায় ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে, যা ইউরোপীয় মানদণ্ডে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল এবং স্পেনের চেয়েও কম। এই সাফল্যের ফলে মজুরি নীতিতে স্পেনকে ছাড়িয়ে যাওয়ার উদাহরণ হিসেবে আলোচনায় এসেছে দেশটি।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে পর্তুগালের জাতীয় ন্যূনতম বেতন ছিল প্রায় ৬৬৫ ইউরো। ধাপে ধাপে তা বাড়িয়ে ২০২৫ সালে ৮৭০ ইউরোর বেশি করা হয় এবং ২০২৬ সালে তা পৌঁছেছে প্রায় ৯২০ ইউরোতে। অর্থাৎ মাত্র চার বছরের ব্যবধানে দেশটি ন্যূনতম বেতন প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সাফল্যের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে সরকারের সুপরিকল্পিত কৌশল। হঠাৎ করে বড় অঙ্কের বেতন বৃদ্ধি না করে সরকার, শ্রমিক সংগঠন ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে কয়েক বছরের পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। এতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
একই সঙ্গে পর্তুগাল সরকার ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য কর ছাড় ও সামাজিক অবদানে বিশেষ সুবিধা দেয়। ফলে শ্রম ব্যয় বাড়লেও ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সীমিত রাখা সম্ভব হয়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ন্যূনতম বেতন বাড়ার ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে, যা স্থানীয় বাজার ও ব্যবসায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। মানুষের হাতে বেশি অর্থ আসায় তারা বেশি খরচ করছে, এতে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও চাঙা হয়েছে।
যদিও পর্তুগালের ন্যূনতম বেতন এখনো স্পেনের তুলনায় কম, তবুও জীবনযাত্রার ব্যয় তুলনামূলক কম হওয়ায় দেশটির শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনমান উন্নত হয়েছে বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
তবে এই নীতির কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যম আয়ের কর্মীদের সঙ্গে নিম্ন আয়ের কর্মীদের বেতনের ব্যবধান কমে আসছে, যা কিছু ক্ষেত্রে শ্রমবাজারে নতুন ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে। পাশাপাশি শহরাঞ্চলে বাড়ির মূল্যবৃদ্ধিও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে, পর্তুগালের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে যে সঠিক পরিকল্পনা, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন এবং ব্যবসায়িক সহায়তা থাকলে ন্যূনতম বেতন বাড়িয়েও কর্মসংস্থান ধরে রাখা সম্ভব। এই কারণে দেশটির মজুরি নীতি এখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।