ইউরোপিয়ান এনভায়রনমেন্ট এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, স্পেনের প্রায় ৭৫ শতাংশ এবং পর্তুগালের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা মরুকরণের ঝুঁকিতে রয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক।
এতে করে স্পেন ও পর্তুগালে ধীরে ধীরে এমন একটি পরিবেশগত সংকট তৈরি হচ্ছে যা ভবিষ্যতে পুরো অঞ্চলটির প্রকৃতি, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রাকে বদলে দিতে পারে।
উর্বর জমি ধীরে ধীরে শুকিয়ে গিয়ে অনুর্বর ও মরুভূমির মতো হয়ে উঠছে। এটি হঠাৎ করে ঘটে না; বরং দীর্ঘ সময় ধরে অদৃশ্যভাবে শুরু হয়। প্রথমে দেখা যায় জমি শুকিয়ে যাচ্ছে, গাছের সংখ্যা কমছে, বুনো ফুল হারিয়ে যাচ্ছে। এর পেছনে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত পশুচারণ, বন উজাড় এবং পানির অযৌক্তিক ব্যবহার।
স্পেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মুরসিয়া, আলমেরিয়া ও আলিকান্তে অঞ্চলে ইতোমধ্যে আধা-শুষ্ক পরিবেশের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। একইভাবে, পর্তুগালের আলেন্তেজো অঞ্চলেও তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বৃষ্টিপাতের পরিবর্তনের কারণে কৃষি ব্যবস্থা চাপে পড়েছে।
এই সংকটের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো জলবায়ু পরিবর্তন। আইবেরিয়ান উপদ্বীপ ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে। গ্রীষ্মকাল দীর্ঘ ও তীব্র গরম হয়ে উঠছে, আর শীতকাল ছোট ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। বৃষ্টিপাত কমে গেছে এবং যখন বৃষ্টি হয়, তখন তা হঠাৎ ভারী বর্ষণ আকারে হয়, যা মাটিতে পানি সঞ্চয় করার বদলে দ্রুত বন্যা সৃষ্টি করে এবং মাটি ক্ষয় বাড়ায়। গত পঞ্চাশ বছরে স্পেনের কিছু অঞ্চলে বার্ষিক বৃষ্টিপাত প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে, এবং পর্তুগালের দক্ষিণাঞ্চলেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। টেগাস (তেজো) ও গুয়াডিয়ানা নদীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলাধারগুলোর পানির পরিমাণ কমে যাচ্ছে, এবং মানুষের বাড়তি চাহিদা ও বাঁধ নির্মাণের কারণে নদীর প্রবাহ সীমিত হয়ে পড়ছে।
কৃষি খাত, যা এই অঞ্চলের ঐতিহ্য ও অর্থনীতির ভিত্তি, সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। অতিরিক্ত চাষাবাদ এবং পশুচারণের ফলে মাটির উর্বরতা কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে সেচের জন্য অতিরিক্ত পানি ব্যবহার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নামিয়ে দিচ্ছে। স্পেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ব্যাপক গ্রিনহাউস কৃষির মাধ্যমে সারা বছর ইউরোপে সবজি সরবরাহ করা হলেও, এর জন্য বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহার করা হয়। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাচ্ছে এবং সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ঢুকে জমিকে অনুর্বর করে তুলছে। পর্তুগালের আলেন্তেজো অঞ্চলেও একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে অনেক কৃষক তাদের জমি ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। ঐতিহ্যবাহী টেকসই কৃষির পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য একফসলি চাষ বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আরও ক্ষতিকর।
মরুকরণের প্রভাব শুধু কৃষিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। গাছপালা ও ঘাসভূমি কমে যাওয়ায় বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। আইবেরিয়ান লিংক্স, ঈগলসহ অনেক প্রজাতি হুমকির মুখে পড়ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে দাবানলও বাড়ছে। ২০১৭ সালে পর্তুগালে ভয়াবহ দাবানলে ১০০ জনের বেশি মানুষ মারা যায়, যা এই সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্ট করে। স্পেনেও প্রতি বছর গ্রীষ্মকালে দাবানল দেখা যায়। গাছপালা ধ্বংস হয়ে গেলে মাটি পানি শোষণ করতে পারে না, ফলে বন্যা ও খরার একটি চক্র তৈরি হয় যা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে।
এই সংকট মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিতেও গভীর প্রভাব ফেলছে। বহু প্রাচীন কৃষি পদ্ধতি ও গ্রামীণ জীবনধারা বিলুপ্তির পথে। গ্রামগুলোতে কাজের অভাব দেখা দেওয়ায় তরুণরা শহরমুখী হচ্ছে, ফলে গ্রামগুলো জনশূন্য হয়ে পড়ছে। একসময় সবুজে ভরা ক্ষেত এখন অনাবাদি পড়ে আছে, আর পুরোনো বাড়িঘর ভেঙে পড়ছে। জমির সঙ্গে মানুষের যে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ছিল, তা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
তবে এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। স্পেন ও পর্তুগালে বিজ্ঞানী, কৃষক ও নীতিনির্ধারকরা একসঙ্গে কাজ করছেন। আলমেরিয়ায় পুনর্ব্যবহৃত পানি ও আধুনিক সেচব্যবস্থা ব্যবহার করে পানির অপচয় কমানোর চেষ্টা চলছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গাছ লাগানো ও উদ্ভিদ পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। পর্তুগালে মন্টাডো নামে একটি ঐতিহ্যবাহী কৃষি পদ্ধতি পুনরুজ্জীবিত করা হচ্ছে, যেখানে গাছ, পশুপালন ও চাষাবাদ একসঙ্গে করা হয়, যা পরিবেশের জন্য টেকসই। আধুনিক প্রযুক্তিও ব্যবহৃত হচ্ছে, যেমন স্যাটেলাইট দিয়ে মাটির অবস্থা পর্যবেক্ষণ, ড্রিপ সেচ, সৌরশক্তিচালিত পানি বিশুদ্ধকরণ এবং খরা সহনশীল ফসল।
এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলা যায়, স্পেন ও পর্তুগাল এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব এবং একটি টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা যেতে পারে। অন্যথায়, এই অঞ্চলগুলো ধীরে ধীরে মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে। মরুকরণ শুধু আফ্রিকা বা এশিয়ার সমস্যা নয়; এটি এখন ইউরোপের বাস্তবতা। তাই এখনই পানি ব্যবস্থাপনা, মাটি সংরক্ষণ এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে টিকিয়ে রাখার জন্য কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজকের পদক্ষেপের ওপর।