দেশের ব্যাংকিং খাতে উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি ব্যাংক— সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল)—এর শীর্ষ ১২০ জন ঋণখেলাপির কাছে আটকে আছে প্রায় ৯২ হাজার ৬২৭ কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এই বিপুল অংকের বিপরীতে গত এক বছরে আদায় হয়েছে মাত্র ৪৬৯ কোটি টাকা— যা শতাংশের হিসাবে মাত্র ০.৫। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকায় আদায় হয়েছে মাত্র ৫০ পয়সা।
সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় জনতা ব্যাংক
তালিকায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটির শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছেই পাওনা ৫৮ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা, অথচ আদায় হয়েছে মাত্র ৫৬ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, সোনালী ব্যাংক-এর ৬ হাজার ৭৪৩ কোটি টাকার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৯ কোটি টাকা। তুলনামূলকভাবে রূপালী ব্যাংক কিছুটা ভালো থাকলেও আদায়ের গতি খুবই ধীর।
মূলধন সংকটে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক
পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, ছয় ব্যাংকের মধ্যে চারটিই তীব্র মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। বিশেষ করে জনতা ও বেসিক ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরেই সংকটে।
সোনালী ব্যাংক ও বিডিবিএল ছাড়া বাকি ব্যাংকগুলো মূলত সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো অনেকটা “লাইফ সাপোর্ট”-এ টিকে থাকা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
আমানত আছে, কিন্তু সঠিক ঋণ বিতরণ নেই
সাধারণ মানুষ এখনো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে আস্থা রেখে আমানত রাখলেও সমস্যা হচ্ছে ঋণ বিতরণে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংক-এর নির্দেশনা অনুযায়ী এসএমই ও কৃষিখাতে ঋণ বিতরণে ব্যর্থ হচ্ছে কিছু ব্যাংক।
বড় করপোরেট ঋণেই বেশি ঝুঁকছে ব্যাংকগুলো, যা পরে খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে।
মামলা ও আইনি জটিলতা বড় বাধা
ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, ঋণ আদায়ে প্রধান বাধা দীর্ঘমেয়াদি মামলা। খেলাপিরা আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে আদায় প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করছেন, ফলে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
অবলোপন করা ঋণেও ভয়াবহ চিত্র
প্রকাশ্য খেলাপির বাইরে আরও ২১ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা ‘রাইট-অফ’ বা অবলোপন করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সোনালী ব্যাংক-এরই রয়েছে ৯ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা।
গত বছর এই খাত থেকে আদায় হয়েছে মাত্র ২৪৫ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞদের মত
অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, এই সংকট কাটাতে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও স্বচ্ছ ঋণ বিতরণ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।
সামগ্রিক চিত্র
বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দুর্বলতা দেশের আর্থিক খাতের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাত্র ১২০ জন খেলাপির কাছে প্রায় লাখ কোটি টাকা আটকে থাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত অস্বাভাবিক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্রিয় হস্তক্ষেপ না হলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।