কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে এবার অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯৯তম ঈদুল ফিতরের জামাত। প্রতি বছরের মতো এবারও লাখো মুসল্লির উপস্থিতিতে পুরো এলাকা পরিণত হয় এক বিশাল জনসমুদ্রে। ভোর থেকেই নরসুন্দা নদীর তীরঘেঁষা এই মাঠের দিকে মানুষের ঢল নামতে থাকে, আর সকাল হওয়ার আগেই মাঠসহ আশপাশের সব এলাকা পূর্ণ হয়ে যায়।
সাত একর আয়তনের মূল ঈদগাহ মাঠ জামাত শুরুর অনেক আগেই কানায় কানায় ভরে যায়। জায়গা সংকুলান না হওয়ায় অসংখ্য মুসল্লি আশপাশের সড়ক, খোলা জায়গা, বাড়ির ছাদ এবং নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন। সকাল ১০টায় জামাত শুরু হলেও তার অনেক আগেই পুরো এলাকা জনসমাগমে ভরে ওঠে।
এবারের জামাতে ইমামতি করেন মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী জামাত শুরুর আগে নির্দিষ্ট সময় অন্তর ফাঁকা গুলির শব্দে মুসল্লিদের প্রস্তুতির সংকেত দেওয়া হয়। নামাজ শেষে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনায় বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
নারীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থাও রাখা হয় শহরের একটি বিদ্যালয় মাঠে, যেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী অংশগ্রহণ করেন। ঈদকে ঘিরে কিশোরগঞ্জে এক মিলনমেলার পরিবেশ তৈরি হয়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মুসল্লিরা আগেই এসে জড়ো হন।
নিরাপত্তার বিষয়টি ছিল বিশেষ গুরুত্বের। অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় এবারও নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সেনাবাহিনী, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, পুলিশ, র্যাবসহ বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন ছিল। ড্রোন ও সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হয়। ঈদগাহের প্রবেশপথে ধাপে ধাপে তল্লাশি এবং ওয়াচ টাওয়ারের ব্যবস্থা ছিল। পাশাপাশি মেডিক্যাল টিম, অ্যাম্বুল্যান্স ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও প্রস্তুত রাখা হয়।
মুসল্লিদের যাতায়াত সহজ করতে বিশেষ ট্রেন চালু করা হয়, যা ভোরে বিভিন্ন এলাকা থেকে কিশোরগঞ্জে পৌঁছে আবার নামাজ শেষে ফিরে যায়। এতে দূরদূরান্ত থেকে আগত মানুষদের যাতায়াত সুবিধা হয়।
ঈদ জামাতকে ঘিরে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। অনেক মুসল্লি বছরের পর বছর ধরে এই জামাতে অংশ নিচ্ছেন বলে জানান। তাদের মতে, এখানে নামাজ আদায় করলে এক ধরনের আলাদা মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায়।
ঐতিহাসিকভাবে শোলাকিয়া ঈদগাহের খ্যাতি বহু পুরোনো। জনশ্রুতি অনুযায়ী, মোগল আমল থেকেই এই স্থানের গুরুত্ব রয়েছে এবং উনিশ শতকেও এখানে বিপুল সংখ্যক মুসল্লির সমাগম হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় আজও এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ ঈদ জামাত হিসেবে পরিচিত।
সব মিলিয়ে, এবারের ঈদ জামাত শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং ছিল লাখো মানুষের অংশগ্রহণে এক বিরল মিলনমেলা, যা শোলাকিয়ার ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।