চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে ইরান ফুটবল দল যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে খেলতে পারবে—এমনই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। বুধবার সকালে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি জানান, বিশ্বকাপ আয়োজনের সহ-স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরান দলকে টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত পেয়েছেন।
ট্রাম্প–ইনফান্তিনো বৈঠক ও ইরানের অনিশ্চয়তা
ইনফান্তিনো জানান, মঙ্গলবার রাতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বিশ্বকাপ প্রস্তুতি নিয়ে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে ইরানের অংশগ্রহণের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে এবং ট্রাম্প ইরান দলকে যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত এ টুর্নামেন্টে অংশ নিতে স্বাগত জানাবেন বলে আশ্বাস দেন বলে দাবি করেন ফিফা সভাপতি।
এর আগে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা–সংকটের কারণে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের শীর্ষ কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দেন, দেশের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধাবস্থা, নিষেধাজ্ঞা ও ভ্রমণ জটিলতা—সব মিলিয়ে ইরান সত্যিই বিশ্বকাপে যাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেছে।
গ্রুপ পর্বে ইরানের সূচি
ফিফার ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, গ্রুপ পর্বে ‘জি’ গ্রুপে খেলবে ইরান। ১৫ জুন ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের ইনগলউডে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে তাদের বিশ্বকাপ মিশন শুরু হওয়ার কথা। ২১ জুন একই ভেন্যুতে দ্বিতীয় ম্যাচে ইরানের প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ২৬ জুন সিয়াটলে তারা মুখোমুখি হবে মিসরের।
এই তিনটি ম্যাচই যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে হওয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন ইরানের অংশগ্রহণকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে। এরপরও ফিফা আশা করছে, সব পক্ষের সমন্বয়ে ইরানকে মাঠে দেখা যাবে।
ইরানি সমর্থকদের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও ফিফার অবস্থান
ইনফান্তিনো ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান দলকে স্বাগত জানানো হলেও দেশটির সমর্থকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ–সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ট্রাম্প প্রশাসনের আগের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার প্রথম ধাপেই ইরানি নাগরিকদের ওপর প্রবেশ–নিষেধ আরোপ করা হয়েছিল, যার প্রভাব এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।
ফিফার বিশ্বকাপ পরিচালনা প্রধান হেইমো শিরগি এর আগে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক অস্থিরতা সৃষ্টি হলেও টুর্নামেন্ট পিছিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তার ভাষায়, বিশ্বকাপ আয়োজনের পরিধি এত বড় যে তা স্থগিত করা সম্ভব নয়; তবে সংস্থাটি ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রতিদিনই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
ফিফার বার্তা: বিশ্বকাপ থামবে না, সবাইকে আশা
হেইমো শিরগি বলেন, প্রতিদিনকার রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি তারা বিশ্লেষণ করছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমাধানের কোনো না কোনো পথ বের হবে বলেই ফিফার বিশ্বাস। তাদের ধারণা, যোগ্যতা অর্জন করা সব দলই মাঠে নামার সুযোগ পাবে এবং বিশ্বকাপ নির্ধারিত সময়েই অনুষ্ঠিত হবে।
ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোও তার ইনস্টাগ্রাম পোস্টে লিখেছেন, বিশ্বকাপের মতো আয়োজন এখন মানুষের মধ্যে সংযোগ ও শান্তির বার্তা ছড়ানোর জন্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন। তিনি ট্রাম্পের ‘সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ’ জানিয়ে আশা প্রকাশ করেছেন, ইরানসহ সব যোগ্য দলকে নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাটিতে বিশ্বকাপ আয়োজন সম্ভব হবে।
আয়োজক স্বত্ব হারানোর নজিরের উদাহরণ
ইরানের অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হলে বা যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরান দলকে স্বাগত জানাতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে ফিফা আয়োজক দেশের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে—এমন ইঙ্গিতও নীতিমালায় আছে। অতীতে এমন নজিরও রয়েছে। তিন বছর আগে পুরুষদের অনূর্ধ্ব–২০ বিশ্বকাপে ইসরায়েল দলকে স্বাগত জানাতে অস্বীকৃতি জানায় ইন্দোনেশিয়া। ফলস্বরূপ, টুর্নামেন্ট শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে ফিফা ইন্দোনেশিয়ার কাছ থেকে আয়োজক স্বত্ব বাতিল করে টুর্নামেন্টটি আর্জেন্টিনায় সরিয়ে নেয়।
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ যদি রাজনৈতিক কারণে বা বৈষম্যমূলক আচরণের ভিত্তিতে অংশগ্রহণকারী দলকে স্বাগত জানাতে না চায়, তবে তাদের আয়োজক হিসেবে থাকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং প্রয়োজনে আয়োজক স্বত্ব অন্য দেশে দিয়ে দেওয়া হয়।
বিশ্বকাপের প্রয়োজনীয়তা ও ‘একতার’ বার্তা
ইনফান্তিনো মনে করেন, চলমান যুদ্ধ ও অস্থিরতার মধ্যেও বিশ্বকাপ আয়োজন বিশ্ব ফুটবল এবং বিশ্ব রাজনীতির জন্য এক ধরনের পরীক্ষাও বটে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ফুটবলকে কেন্দ্র করে মানুষকে একত্র করার ক্ষেত্রে বিশ্বকাপের মতো মেগা ইভেন্টের বিকল্প নেই। তাই যুদ্ধ পরিস্থিতি, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মাঝেও ফিফা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করবে, যেন ইরানসহ সব দল মাঠে নামতে পারে এবং খেলাধুলা রাজনীতির উপরে একটি ইতিবাচক বার্তা পাঠাতে পারে।