২০০৯ সালের পিলখানা ট্র্যাজেডির ১৭ বছর পূর্ণ হলেও মূল হত্যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর), বর্তমান বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদর দপ্তরে সংঘটিত সেই নৃশংস হত্যাযজ্ঞের বিচার এখন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ঝুলে আছে।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পিলখানায় তৎকালীন বিডিআর সদর দপ্তরে দরবারের আড়ালে শুরু হয় বিদ্রোহ। দাবিদাওয়া আদায়ের নামে বিপথগামী সদস্যরা আগ্নেয়াস্ত্র, ভারী অস্ত্র ও বিস্ফোরক ব্যবহার করে আগুন, লুটপাট ও নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চালায়। এ ঘটনায় বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা ও নারী-শিশুসহ মোট ৭৪ জনকে হত্যা করা হয়।
ঘটনার পর পুরো বাহিনী কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, রাষ্ট্রজুড়ে শোক ও ক্ষোভের সুনামি বয়ে যায়। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এ হত্যাকাণ্ড ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে বিদ্রোহ-পশ্চাৎ পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে বিডিআরের নাম পরিবর্তন করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) রাখা হয় এবং বাহিনীর নতুন আইন ও পোশাক চালু করা হয়।
দেশে সর্ববৃহৎ হত্যা মামলা
পিলখানার হত্যাযজ্ঞের পর ২০০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়—একটি হত্যা মামলা ও আরেকটি বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা। হত্যা মামলায় মোট ৮৫০ জনকে আসামি করা হয়, যা আসামির সংখ্যার দিক থেকে দেশের বিচার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ফৌজদারি মামলা হিসেবে উল্লেখিত।
২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর বিচারিক আদালত হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করে। রায়ে ১৫২ জনের মৃত্যুদণ্ড, ১৬০ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৫৬ জনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়; খালাস পান ২৭৮ জন আসামি। এর আগে চারজন আসামি মৃত্যুবরণ করেন।
হাইকোর্টের রায় ও বর্তমান অবস্থা
বিচারিক আদালতের রায়ের পর ফৌজদারি আইনের বিধান অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ক্ষেত্রে ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠানো হয় এবং আসামিরা আপিল করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে তিন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর রায় দেন; তার পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশিত হয় ২০২০ সালের জানুয়ারিতে।
হাইকোর্ট সেই রায়ে ১৩৯ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে, ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন এবং ২২৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়; খালাস পান ২৮৩ জন। পুরো বিচারপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ মিলিয়ে অন্তত ৫৯ আসামি ইতোমধ্যে মারা গেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ২২৬ জন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির পক্ষে ৭৩টি আপিল ও লিভ টু আপিল করা হয়েছে। অন্যদিকে খালাসপ্রাপ্ত কিংবা শাস্তি কমে যাওয়া ৮৩ জন আসামির বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ ২০টি লিভ টু আপিল দায়ের করেছে। এসব আবেদন এখন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায়। রাষ্ট্র ও আসামি উভয় পক্ষই বলছে, তারা শুনানি গ্রহণের জন্য প্রস্তুত; তবে মামলাটির ব্যাপকতা ও বিচারপতির সংকটের কারণে আলাদা বেঞ্চ গঠন এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির প্রয়োজন বলে মত দিচ্ছেন আইনজীবীরা।
বিস্ফোরক মামলার ধীরগতির বিচার
হত্যা মামলার পাশাপাশি বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে করা মামলাটিও এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এই মামলায় আসামি করা হয়েছে ৮৩৪ জনকে; তাদের মধ্যে ৫৭ জন মারা গেছেন এবং ২১ জন পলাতক। মোট সাক্ষী ১ হাজার ৩৪৪ জন, এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থাপিত একটি বিশেষ আদালতে বিচারাধীন।
চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি বিস্ফোরক মামলায় খালাস পাওয়া ১৭৮ জন আসামি বিচারিক আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন, অন্য আসামিরা কারাগারে রয়েছেন। প্রসিকিউশন বলছে, মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ দীর্ঘ হলেও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের জবানবন্দি এখনো অব্যাহত আছে।
রাজনৈতিক শীর্ষ নেতাদের নাম ও নতুন আইনি উদ্যোগ
বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন সাক্ষীর জবানবন্দিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলে নূর তাপস, মির্জা আজম, জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতার নাম উঠেছে বলে প্রসিকিউশন দাবি করছে। তাদের ভাষ্য, ওই সাক্ষ্যগুলোতে পিলখানা হত্যাকাণ্ডে সরাসরি বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে এসেছে এবং এ কারণে এ সকল ব্যক্তির বিরুদ্ধেও মামলা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। (এই অংশটি আপনি যে সোর্স-টেক্সট দিয়েছেন, তা থেকেই উদ্ধৃত তথ্য; উন্মুক্ত অন্য ডিজিটাল সোর্সে এ অভিযোগের বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য আকারে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় না—তাই এ দাবি প্রসিকিউশনের বক্তব্য হিসেবেই উল্লেখ করছি, স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে নয়।)
প্রসিকিউশন নেতৃত্বে বিস্ফোরক মামলার চিফ প্রসিকিউটর বোরহান উদ্দিন গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পর তদন্ত-উদ্ভূত নতুন তথ্যের আলোকে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অন্যদিকে রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তারা বলছেন, হত্যা মামলাটি অনেক দিন ধরে আপিল শুনানির অপেক্ষায় থাকায় এটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে। (এ তথ্যও আপনার প্রদানকৃত সোর্স-টেক্সটের ওপর নির্ভরশীল; পৃথকভাবে স্বাধীন যাচাই সীমিত।)
বিদ্রোহের বিচার ও বাহিনীর পুনর্গঠন
হত্যা ও বিস্ফোরক মামলার বাইরে সারা দেশে বিশেষ আদালত গঠন করে বিডিআর বিদ্রোহের শৃঙ্খলাভঙ্গ ও বিদ্রোহসংক্রান্ত অপরাধে ৫৭টি মামলায় ৫ হাজার ৯২৬ জন জওয়ানকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়; বিচার চলাকালে এসব মামলার কমপক্ষে ৫ জন আসামি মারা যান।
বিদ্রোহের পর বাহিনী পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে শুধু নাম ও ইউনিফর্ম নয়, কাঠামো ও কমান্ড চেইনেও পরিবর্তন আনা হয়। প্রতি বছর ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিজিবি ও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে নিহত সেনা কর্মকর্তা ও বেসামরিক ব্যক্তিদের স্মরণে দোয়া, মিলাদ ও শ্রদ্ধাঞ্জলিসহ নানা কর্মসূচি পালন করা হয়।