পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দুই বেঞ্চে বর্তমানে জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা ২১টি মামলায় ৪৫৭ জন আসামির বিরুদ্ধে বিচার চলছে। চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এসব মামলার আসামিদের মধ্যে ১৬১ জন গ্রেপ্তার অবস্থায়, আর ২৯৩ জন পলাতক; এছাড়া ১ জন আসামি জামিনে, ১ জন খালাসপ্রাপ্ত এবং ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
প্রথমে একটি ট্রাইব্যুনাল দিয়েই বিচারিক কার্যক্রম শুরু হলেও পরে মামলার সংখ্যা ও গুরুত্ব বাড়ায় আরও একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। দুই ট্রাইব্যুনালে এ বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠিত হয়েছে মোট ২৪টি মামলায়; এর মধ্যে তিনটি মামলার রায় ঘোষিত হয়েছে এবং বাকি ২১টি মামলার বিচার কাজ চলমান।
শেখ হাসিনা–আসাদুজ্জামান ও পুলিশের শীর্ষকর্তারা আসামি
ঘোষিত তিনটি রায়ের একটিতে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল–১। একই মামলায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল–মামুন রাজসাক্ষী (অ্যাপ্রুভার) হওয়ায় তাঁর সাজা কমিয়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া আরেক মামলায় ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান হাবিবসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল–২ তাদের বিচারের আদেশ দিয়েছেন; এই মামলায় জুলাই অভ্যুত্থানের সময় যাত্রাবাড়ীতে পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে ইমাম হাসান তাইমকে কাছ থেকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। আবার অন্য এক মামলায় ডিএমপির একই সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ আট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় ছয়জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের রায় ঘোষণাও সম্পন্ন হয়েছে বা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
গাজীপুরের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল–২; ওই মামলায় একজন আসামিকে রাজসাক্ষী হওয়ায় খালাস দেওয়া হয়েছে। সামগ্রিকভাবে, তিনটি ঘোষিত রায়ে মোট ২৬ জন আসামি দণ্ডিত এবং একজন ক্ষমাপ্রাপ্ত বলে প্রসিকিউশন জানায়।
নতুন নতুন রায় ও তদন্তাধীন মামলা
রাজধানীর রামপুরায় নির্মাণাধীন ভবনের ছাদের কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণ আমির হোসেনকে গুলি করে হত্যাসহ দুজনকে হত্যার অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার কাজ শেষ হয়েছে; এই মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ পাঁচজন আসামি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ এই মামলার রায় ঘোষণার জন্য আগামী ৪ মার্চ দিন ঠিক করেছে।
চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের হিসাবে, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠিত মামলাগুলোর বাইরে জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের আরও ৩৪টি মামলা এখনো তদন্ত সংস্থায় তদন্তাধীন আছে। এসব ‘মিস কেস’ বা বিবিধ মামলায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত গুম, হত্যা, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও সংগঠিত হামলার অভিযোগ রয়েছে; তদন্ত শেষ হলে এগুলোরও পর্যায়ক্রমে চার্জ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে।
সেনা ও পুলিশের উচ্চপর্যায়ের আসামি
পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তা আসামির কাডগরায় দাঁড়িয়েছেন। চিফ প্রসিকিউটরের দেওয়া সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ১৬১ আসামির মধ্যে ৭৪ জন সাবেক মন্ত্রী, সাবেক সংসদ সদস্য ও অন্যান্য বেসামরিক ব্যক্তি; ২০ জন সেনা কর্মকর্তা এবং ৬৫ জন পুলিশ সদস্য, পাশাপাশি আনসারেরও একজন সদস্য রয়েছেন।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে করা মামলাতেও সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানসহ মোট ২০ জন সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে বিচার চলছে বা তদন্ত শেষ পর্যায়ে আছে বলে ট্রাইব্যুনাল–সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। জুলাইয়ের মামলাগুলোয় পুলিশের উচ্চপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা মোট ৬৫ জন কর্মকর্তা সরাসরি মানবতাবিরোধী অপরাধের আসামি হিসেবে বিবেচিত হওয়া, এই বিচারপ্রক্রিয়াকে নিরাপত্তা বাহিনী–সম্পর্কিত ‘অভূতপূর্ব’ দায় নিরূপণের একটি ধাপ হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা।