মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনার মধ্যে কৌশলগত অবস্থান পুনর্বিন্যাস শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে কাতার ও বাহরাইনের ঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনা সরানো হচ্ছে, একই সঙ্গে সিরিয়া থেকেও ধাপে ধাপে বাহিনী প্রত্যাহারের প্রস্তুতি চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি নতুন সংঘাতের আশঙ্কা উসকে দিচ্ছে।
পেন্টাগনের একাধিক সূত্রের বরাতে মার্কিন গণমাধ্যম জানিয়েছে, কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি থেকে ইতিমধ্যে কয়েক শ সেনাকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় এই ঘাঁটিতে সাধারণত প্রায় ১০ হাজার সেনা মোতায়েন থাকে। একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বাহরাইনেও, যেখানে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম বহরের সদর দপ্তর অবস্থিত।
এর আগে খবর আসে, সিরিয়ায় থাকা প্রায় এক হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনাও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। দক্ষিণ সিরিয়ার কৌশলগত আল-তানফ ঘাঁটি থেকে সরে আসার বিষয়টি আগেই নিশ্চিত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই সিরিয়া থেকে সেনা কমানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে।
ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা না মিললেও সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলার ঝুঁকি মাথায় রেখেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযান চালায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা তাদের ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে। জাতিসংঘে পাঠানো এক বার্তায় ইরানও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, দেশটি আক্রান্ত হলে অঞ্চলের সব শত্রু ঘাঁটি বৈধ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
তবে কাতার, বাহরাইন ও সিরিয়ায় উপস্থিতি কমালেও ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব, জর্ডান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে এখনো মার্কিন বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। একই সময় অঞ্চলে নৌ ও বিমানশক্তি বাড়ানোর পদক্ষেপও চালিয়ে যাচ্ছে ওয়াশিংটন। নতুন করে একটি বিমানবাহী রণতরী সেখানে পাঠানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।
মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে অল্প সময়ের মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তেহরানকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সমঝোতায় না এলে হামলার হুমকি দিয়েছেন।
অন্যদিকে সিরিয়া থেকে সেনা সরানোর পেছনে ভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক হিসাবও কাজ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশটির নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠন এবং কুর্দি নেতৃত্বাধীন বাহিনীকে জাতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে একীভূত করার লক্ষ্যে একটি সমঝোতার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া এই সমঝোতাকে সিরিয়ার ভাঙন কমিয়ে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদারের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান একদিকে পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে, অন্যদিকে যুদ্ধ প্রস্তুতিও জোরদার রাখা হয়েছে—যা অঞ্চলজুড়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।