বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অলি আহাদ এমন এক ব্যক্তিত্ব, যার জীবনজুড়ে ছিল ভাষার অধিকার, গণতন্ত্র ও জনগণের স্বার্থ রক্ষার নিরলস লড়াই। ভাষা আন্দোলনের সাহসী কর্মী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং পরবর্তী সময়ের একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি বিশেষভাবে স্মরণীয়।
১৯২৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার ইসলামপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া অলি আহাদ শিক্ষাজীবন থেকেই রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। ঢাকা কলেজে পড়াশোনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে ১৯৪৮ সালে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। বহু বছর পর সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন এবং পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক ২১ ফেব্রুয়ারির আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেন। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘ সময় কারাবরণও করতে হয় তাঁকে। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর এই ভূমিকা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
পরবর্তী সময়েও তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে ছিলেন। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে কাজ করেছেন বিভিন্ন সময়ে। কাগমারী সম্মেলনের পর মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ধারার রাজনীতিতে যুক্ত হন। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও নীতিগত কারণে দল থেকে সরে দাঁড়ান। পরে ডেমোক্রেটিক লীগ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত হয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও তিনি সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধেও তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। এরশাদ আমলে একাধিকবার গ্রেপ্তার হন এবং তাঁর সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘ইত্তেহাদ’ বন্ধ করে দেওয়া হয়। গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার রক্ষায় তিনি আজীবন সোচ্চার ছিলেন। তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৪ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে তাঁর লেখা “জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-১৯৭৫” গবেষণাধর্মী একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।
অলি আহাদের ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী ছিলেন অধ্যাপক রশিদা বেগম এবং তাঁদের একমাত্র সন্তান ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, যিনি বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনের সংসদ সদস্য। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ২০১২ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তবে ভাষা আন্দোলন ও গণতন্ত্রের সংগ্রামে তাঁর অবদান আজও প্রেরণা হয়ে আছে।