এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা দেখল বাংলাদেশ। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও প্রতীক্ষার পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করল বিএনপি। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব নিলেন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শপথ বাক্য পাঠ করান এবং নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে নতুন যাত্রার সূচনা ঘোষণা করেন।
জাঁকজমকপূর্ণ শপথ ও আন্তর্জাতিক উপস্থিতি
বিকেল ৪টায় পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। খোলা আকাশের নিচে আয়োজিত এ শপথ অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি কূটনীতিক, রাজনৈতিক নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। বিশেষভাবে উপস্থিত ছিলেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং টোবগে এবং ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা—যা অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক মাত্রা যোগ করে।
৫০ সদস্যের ঘোষিত মন্ত্রিসভার প্রথম ধাপে ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী শপথ নেন। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে ২৪ জন প্রতিমন্ত্রীও শপথ গ্রহণ করেন।
অভিজ্ঞ নেতৃত্বে পূর্ণমন্ত্রীদের তালিকা
পূর্ণমন্ত্রীদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও রাজনীতিক আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকা নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ এবং প্রবীণ নেতা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। এছাড়া বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ উদ্দিন আহমেদ-ও মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন।
আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষায় বিভিন্ন বিভাগ থেকে নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সিলেট, রাজশাহী, বরিশাল ও উত্তরাঞ্চল থেকে অভিজ্ঞ সংসদ সদস্যদের জায়গা দেওয়া হয়েছে নতুন মন্ত্রিসভায়।
টেকনোক্র্যাট ও বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্তি
নতুন সরকারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো টেকনোক্র্যাট অন্তর্ভুক্তি। জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. খলিলুর রহমান এবং প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। নীতিনির্ধারণে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটানোর লক্ষ্যেই এই অন্তর্ভুক্তি বলে জানা গেছে।
প্রতিমন্ত্রীদের দায়িত্ব বণ্টনে চমক
পূর্ণমন্ত্রীদের শপথের পরপরই ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি—যিনি অর্থ, পরিকল্পনা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। গণঅধিকার পরিষদের নেতা নুরুল হক নুর পেয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। শিক্ষাবিদ-রাজনীতিক ববি হাজ্জাজ দায়িত্ব পেয়েছেন শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের।
এছাড়া পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন শামা ওবায়েদ ইসলাম। জ্বালানি খাতে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ে ব্যারিস্টার কায়সার কামালের মতো নতুন মুখ যুক্ত হয়েছেন প্রশাসনে।
আগামীর অগ্রাধিকার
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক সংস্কার। বিএনপির সংসদীয় দল ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে—কোনো সদস্য সরকারি শুল্কমুক্ত গাড়ি বা প্লট গ্রহণ করবেন না। এটিকে নতুন সরকারের নৈতিক অবস্থানের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।শপথ শেষে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা জনগণের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। বঙ্গভবন ও গণভবনে রাত থেকেই শুরু হয়েছে নতুন সরকারের আনুষ্ঠানিক কর্মযজ্ঞ।
দীর্ঘ ১৮ মাসের রাজনৈতিক অচলাবস্থার পর দেশের মানুষ এখন তাকিয়ে আছে—নবীন ও প্রবীণের সমন্বয়ে গঠিত এই মন্ত্রিসভা কত দ্রুত স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে দেশকে এগিয়ে নিতে পারে।