প্রবাস জীবনের কর্ম ব্যস্তময় সময়। কীভাবে পার হয় মাস, বছর –টের পাওয়া যায় না।
তবু বছর ঘুরে রমজান এলে খুব বেশি মনে পড়ে দেশের কথা। সন্ধ্যায় ইফতারের সময়ের মাগরিবের আজান শোনা হয় না কত দিন। মায়ের ডাক শোনা যায় না- “খোকা আজান দিছে, ইফতার করতে আয়।”
রমজান শুধু সংযমের মাস নয়, এই মাসের সাথে বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতির শিকড় অনেক গভীরে লুকিয়ে থাকে। বছর ঘুরে রমজান এলে প্রবাসীদের কর্মজীবনে বিশেষ পরিবর্তন আসে না। বরং প্রবাসের কঠিন জীবনে অনেক বাংলাদেশি শ্রমজীবীদের হৃদয়ে নেমে আসে এক অদ্ভুত নীরবতা।
পাড়ার মসজিদের সন্ধ্যার আলো, আর পরিবারের সঙ্গে বসে দোয়া করার সেই চিরচেনা মুহূর্তগুলো এখানে কঠিন বাস্তবতায় হারিয়ে যায়। প্রবাসে নেই সেই গন্ধ, নেই সেই চেনা কোলাহল, নেই প্রিয় মুখগুলো। —আছে শুধু কাজের তাড়া, সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ আর বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা এক সমুদ্রভরা স্মৃতি। সূর্য ডোবে দেরিতে, কাজ শেষ হয় আরও পরে, তবুও ক্লান্ত শরীর আর ভেজা চোখ নিয়েই তারা রোজা রাখেন—কারণ এই রোজা তাদের কাছে শুধু ইবাদত নয়, দূরদেশে থেকেও নিজের শেকড় আঁকড়ে থাকার এক গভীর, নীরব ভালোবাসা।
স্পেনের মাদ্রিদে থাকে “সোহেল”। রোজার এই বাস্তবতার এক নীরব প্রতিচ্ছবি। তার কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। দিনে তিনি গ্লোভোর ব্যাগ পিঠে নিয়ে সাইকেল চালিয়ে মানুষের ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দেন। ইফতারের সময় কখন হবে, তিনি তা ঠিক করেন না—মোবাইলের অ্যাপে অর্ডারের চাপই ঠিক করে দেয় তার সময়। কখনো কোনো অ্যাপার্টমেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে, কখনো রাস্তার মোড়ে সাইকেল ঠেকিয়ে খেজুর আর পানির বোতল দিয়ে ইফতার করেন। সাইকেল চালাতে চালাতে হঠাৎ থেমে যান—মনে পড়ে গ্রামের বাড়ির সেই সোনালি বিকেল, মায়ের ডাক, টেবিলভরা ইফতার আর মসজিদের মাইকে ভেসে আসা আজান। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, কিন্তু পরের অর্ডারের নোটিফিকেশন তাকে আবার বাস্তবে ফিরিয়ে আনে।
কাতালোনিয়ায় নির্মাণশ্রমিক “রাশেদ” (ছদ্মনাম) ভোররাত তিনটায় উঠে সেহেরি করেন। রান্না বলতে আগের রাতে রাখা ভাত, ডিম ভাজি আর পানি। চারটায় ফজর পড়ে একটু ঘুমানোর সুযোগ থাকলেও অধিকাংশ দিনই তা হয় না। সকাল সাতটার মধ্যে তাকে কাজে পৌঁছাতে হয়। গরমে কাজ করতে করতে বিকেল গড়িয়ে যায়, কিন্তু ইফতারের সময় তখনও অনেক দূর। কাজের সাইটে বসে খেজুর আর পানির বোতল হাতে নিয়ে সূর্য ডোবার অপেক্ষা করতে করতে তার মনে পড়ে গ্রামের বাড়ির মসজিদের মাইক, মায়ের হাতের বেগুনি আর ছোট ভাইয়ের হাসিমুখ।
ইতালির মিলানে গার্মেন্টসের গুদামে কাজ করা “শাহীন”। রোজার সময় সবচেয়ে বেশি কষ্ট পান সময়ের কারণে। কাজের চাপের জন্য নির্দিষ্ট বিরতি মেলে না। ইফতারের সময় চলে আসে, কিন্তু কাজের লাইন থামানো যায় না। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে থাকলে এই সময় বাসায় সবাই মিলে টেবিলে বসতাম। এখানে মেশিনের শব্দের মধ্যে লুকিয়ে খেজুর খাই।” তার চোখে পানি আসে, কিন্তু সহকর্মীরা যেন না দেখে, সে জন্য দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নেন।
ফ্রান্সের প্যারিসে ফুড ডেলিভারি করা “নাঈম” (ছদ্মনাম) ইফতার করেন রাস্তায় দাঁড়িয়ে। এক হাতে বাইকের হ্যান্ডেল, অন্য হাতে মোবাইল অ্যাপ—এর মধ্যেই সময় দেখে খেজুর মুখে দেন। মাঝে মাঝে কোনো পার্কের বেঞ্চে বসে পানি খেয়ে আবার ছুটতে হয় পরের অর্ডারের জন্য। তিনি বলেন, “রোজার আনন্দ আছে, কিন্তু একা ইফতার করতে বসলে মনে হয় জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতা এই প্রবাস।”
জার্মানির বার্লিনে ক্লিনিং সার্ভিসে কাজ করা “মরিয়ম” (ছদ্মনাম) স্বামী-সন্তান দেশে রেখে একা থাকেন। ভিডিও কলে ছেলের মুখ দেখে ইফতার করেন। ছেলেটি স্ক্রিনের ওপাশ থেকে বলে, “আম্মু তুমি কবে আসবা?” এই একটি প্রশ্ন তার পুরো রোজার মাসটাকে আরও ভারী করে তোলে। তারপরও নামাজ শেষে দোয়া করেন—এই কষ্ট যেন একদিন পরিবারের জন্য সুখ হয়ে ফিরে আসে।
পর্তুগালের লিসবনে রেস্টুরেন্টে কাজ করা “জসিম” (ছদ্মনাম) ইফতার করেন অন্যদের খাবার পরিবেশন করতে করতে। ইফতারের সময়টায় তার কাজ সবচেয়ে বেশি থাকে। রাত গভীর হলে, যখন সব গ্রাহক চলে যায়, তখন তিনি চুপচাপ বসে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া খাবার দিয়ে ইফতার সম্পন্ন করেন। তার ভাষায়, “রোজা রাখার তৃপ্তি আছে, কিন্তু ইফতারের সময় পরিবারের পাশে না থাকতে পারার কষ্টটা সবকিছুকে হার মানায়।”
যুক্তরাজ্যের লন্ডনে ট্যাক্সি চালানো “হাবিব” (ছদ্মনাম) ইফতারের সময় গাড়ি রাস্তার পাশে থামিয়ে দেন। ছোট একটি বক্সে রাখা খেজুর, পানি আর একটি কলা—এটাই তার প্রতিদিনের ইফতার। গাড়ির জানালার বাইরে ব্যস্ত শহর ছুটে চলে, আর তার মনে পড়ে গ্রামের বাড়ির সেই মাগরিবের আজান, যেখানে ইফতারের আগে সবাই একসঙ্গে দোয়া করত।
এই প্রবাসজীবনে রোজা শুধু ক্ষুধা-তৃষ্ণার পরীক্ষা নয়, এটি মানসিক শক্তিরও পরীক্ষা। পরিবার থেকে দূরে একা থাকা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনিশ্চিত কাগজপত্রের জীবন, ভিন্ন আবহাওয়া—সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিয়েও তারা রোজা রাখেন এক গভীর ভালোবাসা নিয়ে। বাংলাদেশের স্মৃতিময় ইফতার, মসজিদের তারাবি, আত্মীয়স্বজনের দাওয়াত—সবকিছু যেন তাদের হৃদয়ে একসঙ্গে বাজতে থাকে।
তবুও এই কষ্টের মধ্যেও এক ধরনের প্রশান্তি আছে। কারণ দিনের শেষে তারা জানেন—এই ত্যাগ, এই কষ্ট, এই একাকিত্ব—সবকিছুই প্রিয়জনদের ভালো রাখার জন্য। ইউরোপের আকাশে সূর্য ডুবতে দেরি হয়, কিন্তু তাদের বিশ্বাসের আলো কখনও নিভে যায় না। রোজার প্রতিটি দিন তাদের মনে করিয়ে দেয়—দূরে থাকলেও তারা বাংলাদেশেরই মানুষ, সেই শেকড়ই তাদের শক্তি।