দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও আন্দোলনের পর অবশেষে সরকার গঠনের পথে বিএনপি। বেসরকারি ফলাফল ও দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পেয়ে এককভাবে সরকার গঠনের সক্ষমতা অর্জন করেছে দলটি। ফলে দলীয় প্রধান তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ প্রায় নিশ্চিত বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
তবে রাত তিনটা পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন কোনো আসনের পূর্ণাঙ্গ সরকারি ফল ঘোষণা করেনি। বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া তথ্য ও প্রতিনিধিদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জানা গেছে, বিএনপি অন্তত ২০৪টি আসনে বিজয় নিশ্চিত করেছে এবং আরও কয়েকটিতে এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ৭০টির বেশি আসনে জয় পেয়েছে বলে দাবি করছে, যা তাদের প্রধান বিরোধী দল হওয়ার সম্ভাবনা জোরদার করেছে।
উৎসবমুখর ভোট, ৬২ শতাংশ উপস্থিতি
সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত দেশের ২৯৯টি আসনের ৪২ হাজারের বেশি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। গড় ভোটার উপস্থিতি প্রায় ৬২ শতাংশ বলে নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক তথ্য থেকে জানা গেছে। দীর্ঘ সময় পর এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। অনেকেই ভোটের পরিবেশকে “ঈদের আমেজ”-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে বড় ধরনের সহিংসতা এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে ইসি জানিয়েছে। যদিও বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ, ব্যালট ছিনতাই ও ককটেল বিস্ফোরণের মতো কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। ইসির তথ্য অনুযায়ী, ২৯টি সংঘর্ষে শতাধিক ব্যক্তি আহত হন।
অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ
ভোট চলাকালে কয়েকটি রাজনৈতিক দল অনিয়মের অভিযোগ তোলে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট কয়েকটি আসনের কেন্দ্র স্থগিতের দাবি জানায় এবং ভিডিওসহ লিখিত অভিযোগ জমা দেয়। ইসলামী আন্দোলনও চারটি আসনে কেন্দ্র বাতিলের আবেদন করে। তবে বিএনপিসহ বড় দলগুলোর পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনে আনুষ্ঠানিক বড় অভিযোগ দেখা যায়নি।
ইসি জানিয়েছে, অভিযোগগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখন পর্যন্ত কোনো কেন্দ্রের ভোট বাতিল হয়নি বলেও তারা উল্লেখ করেছে।
পোস্টাল ব্যালট ও গণভোট
এবারের নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় ভোটারদের আগ্রহ ছিল বেশি। প্রায় ১২ লাখের বেশি ভোটার পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ বৈধ হিসেবে গৃহীত হয়েছে।
দেশি-বিদেশি পাঁচ শতাধিক পর্যবেক্ষক এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস পূর্বেই অবাধ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, অংশগ্রহণমূলক এই নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় নতুন অধ্যায় সূচিত করতে পারে।
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট
২০০১ সালের পর এই প্রথমবার বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে দলটির নেতাকর্মীরা রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগ তুলে আসছিলেন। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এবারের ভোটকে অনেকে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নির্বাচন’ হিসেবে দেখছেন।
চূড়ান্ত সরকারি ফল ঘোষণার পর নতুন সংসদের অধিবেশন ও সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে তারেক রহমানের নেতৃত্বেই নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নেবে—এমন প্রত্যাশাই এখন বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে প্রবল।