অনিয়মিত অভিবাসন এবং এর মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া মানবপাচারকারী চক্রগুলো ভেঙে দিতে এবার আন্তর্জাতিক শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করেছে যুক্তরাজ্য।
মানবপাচারের বিরুদ্ধে সমন্বিত ও আন্তর্জাতিকভাবে লড়াই করতে ৪০টি দেশের প্রতিনিধি নিয়ে সম্মেলনটির আয়োজন করেছে দেশটি।
মানবপাচার ঠেকাতে এটিই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলন৷ ৪০টি দেশের মন্ত্রী এবং আইনপ্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের নিয়ে লন্ডনে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে৷ ৩১ মার্চ শুরু হয়ে বৈঠকটি চলবে ১ এপ্রিল পর্যন্ত।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অনিয়মিত অভিবাসন বন্ধ এবং ইংলিশ চ্যানেলজুড়ে অভিবাসীবাহী নৌকা থামাতে নানা উদ্যোগ নিয়ে আসছে যুক্তরাজ্য সরকার। তারই ধারাবাহিকতায় দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও অনিয়মিত অভিবাসন বন্ধে নতুন নতুন উপায় খুঁজছেন।
অনিয়মিত অভিবাসনের কারণে দেশটির স্বাস্থ্য ও আবাসন খাতে ভয়াবহ চাপ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করে আসছে সরকার৷ এ নিয়ে দেশটির নাগরিকেরাও বেশ উদ্বিগ্ন৷ এমন বাস্তবতায়, অভিবাসন ব্রিটিশ রাজনীতির প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে৷
এই সম্মলেনের নাম দেয়া হয়েছে অভিবাসন সংক্রান্ত সংগঠিত অপরাধ (অর্গানাইজড ইমিগ্র্যান্টস ক্রাইম-ওআইসি) শীর্ষ সম্মেলন৷ এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রতিটি পর্যায়ে মানবপাচার ঠেকাতে বিশেষ রূপরেখা তৈরি করা হবে৷ ফ্রান্স থেকে যুক্তরাজ্য ভ্রমণে ইংলিশ চ্যানেলে ব্যবহার করা ছোট নৌকাগুলোর সাপ্লাই চেইন ভেঙে দেয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ পারাপারে উৎসাহিত হতে যেসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়, সেগুলো বন্ধ করাসহ নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
সম্মেলনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘এই জঘন্য বাণিজ্য আমাদের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে থাকা ফাটলকে কাজে লাগায়, জাতিগুলোকে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করায় এবং রাজনৈতিক পর্যায়ে আমাদের একত্রিত হতে না পারার সুযোগ থেকে লাভবান হয়।’’
গত বছর অভিবাসীদের চ্যানেল পাড়ি দিতে উৎসাহ যোগানো আট হাজারেরও বেশি বিজ্ঞাপন বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে৷ এছাড়াও মানবপাচার চক্র ভেঙে দিতে অন্তত ছয়শ ইঞ্জিন জব্দ করা হয়েছে এবং অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মেটা, এক্স এবং টিকটকের প্রতিনিধিরাও অংশ নিচ্ছেন এই সম্মেলনে।
গত বছর সাধারণ নির্বাচনের সংখ্যাগরিষ্ঠ জয় নিয়ে যুক্তরাজ্যের ক্ষমতায় আসে কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টি। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে স্টারমার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, অনিয়মিত পারাপারের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলোকে তিনি ভেঙে দেবেন৷ এমনকি, আশ্রয়প্রার্থীদের রুয়ান্ডা পাঠাতে নেয়া আগের রক্ষণশীল সরকারের পরিকল্পনাটিও বাতিল করে দেন তিনি৷
মানবপাচারকারী চক্রকে সন্ত্রাসী হিসাবে বিবেচনা করে কঠোর অবস্থান নিতে আইনও প্রণয়ন করেছে যুক্তরাজ্য সরকার৷ আইনটি দ্রুত কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং বিশ্বের অন্যান্য স্থান থেকে আসা অভিবাসীরা ছোট ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে পৌঁছাতে পাচারকারীদের হাজার হাজার পাউন্ড অর্থ দেয়।
এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে মানবপাচারে অর্থায়ন কীভাবে হয় এবং তা বন্ধে করণীয় নির্ধারণে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
আলবেনিয়া, ভিয়েতনাম এবং ইরাকের মতো অভিবাসীদের উৎস দেশগুলো ছাড়াও এ আলোচনায় যোগ দিয়েছে ফ্রান্স, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনও।
সম্মেলনে স্টারমার আরো বলেন, ‘‘অভিবাসন সংক্রান্ত সংগঠিত অপরাধ মোকাবিলা করা যাবে না, এমন কথা আমি বিশ্বাস করি না৷ আমাদের সম্মিলিত সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে হবে, গোয়েন্দা তথ্য এবং কৌশল ভাগ করে নিতে হবে এবং মানবপাচার রুটের প্রতিটি ধাপের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।’’
ব্রিটিশ সরকারের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে ৩৬ হাজার আটশ জনেরও বেশি মানুষ ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে যুক্তরাজ্যে এসেছেন৷ সংখ্যাটি তার আগের বছরের তুলনায় অন্তত ২৫ শতাংশ বেশি।
২০২৫ সালে এখন পর্যন্ত ছয় হাজার ছয়শ জনেরও বেশি মানুষ চ্যানেল পেরিয়ে যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছেন।
মন্তব্য করুন