একটি নতুন অর্থনৈতিক গবেষণায় দেখা গেছে, জার্মানিতে বিনা খরচে উচ্চশিক্ষা নেয়ার পরও দেশটির অর্থনীতিতে শত কোটি টাকা যোগ করছে বিদেশি শিক্ষার্থীরা৷ তাই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জার্মানির রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্য দেখা হচ্ছে আশীর্বাদ হিসাবে৷ বিদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়োগেও আরো বেশি পদক্ষেপ নিতেও আগ্রহী জার্মান শিল্প৷
গত সপ্তাহে প্রকাশিত জার্মান অর্থনৈতিক ইনস্টিটিউটের (আইডাব্লিউ) এক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে উচ্চশিক্ষায় জার্মানিতে আসা শিক্ষার্থীরা জার্মানির রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বিপুল পরিমাণ অর্থ যোগ করছেন এবং দেশটির অর্থনীতিকে আরো গতিশীল করতে ভূমিকা রাখছেন৷
কোলনভিত্তিক গবেষকেরা হিসাব করে দেখেছেন, ২০২২ সালে জার্মানিতে পড়াশোনা শুরু করা ৭৯ হাজার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী তাদের জীবদ্দশায় কর এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে প্রায় এক হাজার ৫৫০ কোটি ইউরোর বেশি অর্থের যোগান দেবে জার্মানির রাষ্ট্রীয় কোষাগারে এবং পরবর্তী তার সুবিধা তারাও পাবেন৷
গবেষণাটির পরিচালক জার্মান একাডেমিক এক্সচেঞ্জ সার্ভিস (ডিএএডি) এর প্রেসিডেন্ট জয়ব্রত মুখার্জি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, গবেষণালব্ধ ফলাফল থেকে প্রতীয়মান হয়, ‘‘আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা আমাদের দেশের জন্য অনেক দিক থেকেই সম্পদ, অবশ্যই শিক্ষাগতভাবে, তবে অর্থনৈতিকভাবেও৷’’
২০২২ সালের ওইসিডি-এর একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, জার্মানিতে আসা বিদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনা শেষে দেশটিতে ‘থাকার হার’ বেশ ভালো৷ ২০১০ সালে শিক্ষার্থী ভিসায় জার্মানিতে আসা প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ ১০ বছর পরেও জার্মানিতে ছিলেন৷ আইডাব্লিউ বলছে, যদি ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করার পরও তিন বছর ধরে দেশটিতে থাকেন, তাহলে তাদের শিক্ষার খরচ তাদের কর এবং সামাজিক নিরাপত্তা অবদানের মাধ্যমে পুষিয়ে যায়৷
শিক্ষার্থীরা কেন জার্মানি পছন্দ করেন?
উচ্চশিক্ষায় জার্মানিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আসার অনেক কারণ থাকতে পারে৷ কিন্তু মিশরীয় সফটওয়্যার ডেভেলপার ইউনিস এবাইদের জন্য জার্মানি আসার একটি বিশেষ কারণ ছিল৷ ২০২১ সালে দক্ষিণ জার্মান শহর ইঙ্গোলস্টাটে আসেন তিনি৷ বাভারিয়ান শহরের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অফ অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেস (টিএইচআই) থেকে অটোমেটিভ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ইংরেজি ভাষার মাস্টার্স প্রোগ্রাম করা ছিল তার উদ্দেশ্য৷
২৮ বছর বয়সি এই তরুণ ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘আমার প্রথম বিকল্প ছিল ইংরেজি ভাষাভাষী দেশ, তবে তা ছিল খুবই ব্যয়বহুল৷’’
তিনি বলেন, ‘‘জার্মানি ছিল সবচেয়ে সাশ্রয়ী বিকল্প৷’’ জার্মানির বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনা খরচে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে, এমনকি বিদেশি শিক্ষার্থীরাও সেই সুযোগ পান৷ জার্মানি হয়তো বহু দশক আগে সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য বিনামূল্যে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে৷ কিন্তু এটি এখন দেশে দক্ষ কর্মী আকর্ষণের জন্য একটি প্রণোদনা হিসাবেও কাজ করছে৷
ইউনিস বলেন, ‘‘আমরা শুধু পাবলিক সেমিস্টারের জন্য অর্থ দিই৷ আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি সেমিস্টারে এটি ছিল ৬০ ইউরো, যা আমার নিজ দেশ মিশরের বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও কম৷’’
ইঙ্গোলস্টাট আরো কয়েকটি কারণে আকর্ষণীয় ছিলো৷ মাত্র এক লাখ ৪০ হাজার মানুষের এই শহরটি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আউডির আবাসস্থল৷ টিএইচআই-তে করা গবেষণার বেশিরভাগ অর্থায়ন করে আউডি৷ ইউনিস বলেন, তার অনেক অধ্যাপকেরই আউডির মতো জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে৷
তিনি বলেন, ‘‘মূলত পুরো শহরটি অটোমেটিভের শ্বাস নেয়, তাই এটি একটি খুব ভালো বিকল্প ছিল৷’’
কর্মজীবী শিক্ষার্থী
বাভারিয়ায় জীবনযাত্রার খরচ মিশরের তুলনায় অনেক গুণ বেশি৷ কিন্তু জার্মানিতে বিনা খরচে জীবনযাপনের সুযোগ ইউনিসের ছিল না৷ তাই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় মিউনিখে একজন সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবে খণ্ডকালীন কাজ খুঁজে নেন৷
আইডাব্লিউ-এর সিনিয়র অর্থনীতিবিদ এবং প্রতিবেদনের সহ-লেখক ভিডো গইাস-ট্যোনে বলেন, গবেষণা কাজে এটিই বিস্মিত করেছে যে ‘‘আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যেই অর্থাৎ তাদের পড়াশোনার সময় থেকেই অবদান রাখছে, কারণ তাদের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থান খুঁজে নেয়৷’’
তবে গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী সময়টা একটু কঠিন ছিল৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যস্থতায় থাকা খণ্ডকালীন চাকরিগুলো শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য৷ একবার গ্র্যাজুয়েশন হয়ে গেলে, বিদেশি শিক্ষার্থীরা চাকরির বাজারের একটু কোণঠাসা থাকেন৷ জার্মানির গাড়ি শিল্প বর্তমানে একটি কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে৷ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আউডি এবং ভিডাব্লিউ, দুই প্রতিষ্ঠানই কর্মী ছাঁটাই করছে৷
ইউনিস বলেন, ‘‘আমি যখন প্রথম জার্মানিতে আসি, তখন অর্থনীতি বেশ ভালো অবস্থায় ছিল৷’’
তিনি আরো বলেন, ‘‘কিন্তু ২০২৪ সালে যখন আমি আমার মাস্টার্স শেষ করি, তখন পতন শুরু হয়৷ আমি এই পূর্ণকালীন কাজটি পাওয়ার আগে, একটি চাকরির আশায় আট মাস ধরে আবেদন করে গেছি৷’’
ওইসময় রেস্তোরাঁ ও হোটেলে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছিলেন ইউনিস৷ কিন্তু ইউনিস এখন একটি বৈশ্বিক ভারতীয় কোম্পানির সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার৷ প্রতিষ্ঠানটি জার্মান গাড়ি নির্মাতাদের জন্য সফটওয়্যার তৈরি করে৷
ইউনিস বলেন, ‘‘আমি ভাগ্যবান৷ এটি এমন কয়েকটি কোম্পানির মধ্যে একটি ছিল, যারা বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ পাচ্ছিল৷’’
এসময় সহপাঠীদের কথা উল্লেখ করেন ইউনিস৷ যাদের অনেকে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ খুঁজছিলেন৷
এখানেই থাকবেন?
ইউনিসের অভিজ্ঞতা আইডাব্লিউ-এর অনুসন্ধানের সঙ্গে মিলে যায়৷ গাইস-ট্যোনে বলেন, গত এক দশক ধরে বিদেশি শিক্ষার্থীদের রাখার জন্য আইনি কাঠামো তৈরির চেষ্টা করেছে জার্মানি৷
তিনি আরো বলেন, ‘‘অ্যাংলো-স্যাক্সন বিশ্বে, সবখানে এমনটা হয় না যে তারা আসলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের রাখতে চায়৷’’ এক্ষেত্রে কখনও কখনও আইনি বাধা থাকে বলেও জানান তিনি৷
অন্যান্য দেশগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সম্ভবত প্রধানত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অতিরিক্ত আয়ের উৎস হিসাবে দেখা হয়৷ তবে, জার্মানির ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্ন৷ মনে হচ্ছে, জার্মান শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোকে নিয়োগের ক্ষেত্র হিসাবে দেখতে শুরু করেছে৷
বিষয়টি সরাসরি উপলব্ধি করা ইউনিস বলেন, ‘‘আমার মতে, ইতিমধ্যেই যে ব্যবস্থাটি চালু আছে তা খুবই ভালো৷’’
তিনি বলেন, ‘‘আমার বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে আপনার সিভি প্রস্তুত করবেন, কীভাবে সাক্ষাৎকারে ভালো করবেন, কীভাবে জার্মান বাজারে প্রবেশ করবেন সে সম্পর্কে কর্মশালার আয়োজন করেছিল৷ তারা বছরে একবার চাকরি মেলারও আয়োজন করে, যেখানে তারা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোম্পানিগুলোকে নিয়ে আসে৷’’
ইউনিস বলেন, তার পরিকল্পনা ছিল পড়াশোনার পর জার্মানিতেই থাকার৷ কিন্তু দেশটির বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তিনি নিশ্চিত নয় যে, তার পক্ষে সবসময় জার্মানিতে থাকা কতটা সম্ভব হবে৷ তিনি বলেন, ‘‘প্রধান সমস্যা হলো, বড় কোম্পানিগুলো অর্থ হারাচ্ছে, তাই তারা অনেক প্রকল্প বন্ধ করে দিচ্ছে এবং অনেক লোককে ছাঁটাই করছে৷’’
যদিও জার্মানি অনেক কিছু ঠিকঠাক করছে বলে মনে হচ্ছে, উন্নতিরও সুযোগ রয়েছে৷ ইউনিস বলেন, জার্মানিতে তার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ভাষার ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক নমনীয়তার অভাব৷
তিনি বলেন, ‘‘কিছু সরকারি অফিসের তথ্য শুধু জার্মান ভাষায় পাওয়া যায়৷ যদিও সেখানকার লোকেরা ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন, কিন্তু তারা শুধু জার্মান বলতে পছন্দ করেন৷’’
তার পরামর্শ হলো, ‘‘এটি এমন একটি বিষয়, চাইলে সেটার উন্নতি সম্ভব৷ ভাষার ক্ষেত্রে কিছুটা সহনশীল হওয়া দরকার৷’’
যদিও তার নিজের চাকরিতে জার্মান ভাষা বলার প্রয়োজন হয় না, কারণ তার কর্মক্ষেত্রের ভাষা ইংরেজি৷ কিন্তু ইউনিস জার্মান শিখছেন, কারণ তিনি জার্মানিতে স্থায়ী বসবাসের আবেদন করতে চান৷
তিনি বলেন, ‘‘আমি যদি জার্মান ভাষায় আরো দক্ষ হতাম, তাহলে আমার জীবন অনেক সহজ হতো৷’’ ‘‘কর্মক্ষেত্রের ভাষা জার্মান বলে আমাকে অনেক কোম্পানিতে প্রত্যাখ্যাত হতে হয়েছে,’’ বলেন তিনি৷
আইডাব্লিউ ‘‘অভিবাসনকে আরো উন্নত’’ করার পাশাপাশি গ্র্যাজুয়েটদের কর্মক্ষেত্রে কীভাবে আরো ভালোভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তার জন্য বিভিন্ন সুপারিশ দিয়েছে৷ সংস্থাটি আরো বলেছে, জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার এই সংস্কৃতি বন্ধ করা উচিত হবে না৷
আইডাব্লিউ’র যুক্তি হলো, বিশ্বজুড়ে মানুষকে শিক্ষিত করা জার্মানির জন্যই লাভজনক, কারণ এটি অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে৷ কেউ পড়াশোনা শেষ করে যদি জার্মানি ছেড়ে চলেও যায়, তবুও শিক্ষাবিদদের নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
মন্তব্য করুন