আফ্রিকার দেশ লিবিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থাপনার প্রতি ইটালির দৃষ্টিভঙ্গি ও সহযোগিতার কড়া সমালোচনা করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
১১ মার্চ ইটালির চেম্বার অব ডেপুটিজে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা কমিটির যৌথ অধিবেশনে যোগ দিয়ে লিবিয়ার প্রতি ইটালির সমর্থনের সমালোচনা করেন সংস্থাটির মুখপাত্র অ্যানেলিসে বালদাচিনি।
তিনি বলেন, ‘‘২০২৪ সালের ‘অপারেশন সেফ মেডিটেরেনিয়ান’ এর মতো চলতি বছরও লিবিয়া কর্তৃপক্ষকে, মানে তথাকথিত লিবিয়ান কোস্ট গার্ডকে সহযোগিতা দিচ্ছে ইটালি। এছাড়া, অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় লিবিয়ান কোস্ট গার্ড এবং দেশটির নৌবাহিনীকে প্রশিক্ষণ সহযোগিতাও দিচ্ছে ইটালি৷’’
বালদাচিনি বলেন, ‘‘বেশ কয়েক বছর ধরে শরণার্থীদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে লিবিয়ান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ইউরোপীয় এবং ইটালিয়ান সহযোগিতার ঘটনাপ্রবাহ নথিভুক্ত করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।’’
লিবিয়ায় মানবতাবিরোধী অপরাধ
সমুদ্রে আটকেপড়া অভিবাসীদের জন্য লিবিয়া এখনও একটি বিপজ্জনক দেশ বলে মনে করে জাতিসংঘ৷
আর সেই কথাটি আবারো স্মরণ করিয়ে দিলেন বালদাচিনি। তিনি বলেন, ‘‘সংস্থাটি (জাতিসংঘ) বলেছে, অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা কার্যত একটি রাষ্ট্রীয় নীতি।
লিবিয়ায় যে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে এবং দেশটির মধ্য থেকে উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও যে এর সঙ্গে জড়িত, তা বিশ্বাস করার মতো যুক্তিসঙ্গত কারণ খুঁজে পেয়েছে জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত মিশন৷ তাই প্রতিবেদনটিতে, এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত সব লিবীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তা বন্ধের সুপারিশ করা হয়েছে।’’
তিনি আরো বলেন, ‘‘দুর্ভাগ্যবশত লিবিয়ায় এসব কর্মকাণ্ডের জন্য শক্তিশালী মিলিশিয়া কমান্ডারদের বিচারের আওতায় আনার কোনো পরিকল্পনা নেই।’’
কিন্তু দায়মুক্তির এই চক্র ভাঙার জন্য আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ব্যবস্থাকে কার্যকর করা প্রয়োজন বলে মনে করেন অ্যামনেস্টির এই মুখপাত্র।
আল মাসরি মামলার সঙ্গে সংযোগ
অ্যামনেস্টি মনে করে, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং অভিবাসী চোরাচালান ও নির্যাতনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা লিবিয়ান জেনারেল নিজিম ওসামা আল মাসরিকে গ্রেপ্তার এবং তারপর তাকে মুক্তি দেয়ার ঘটনায় বাজে নজির তৈরি করেছে ইটালি৷
একসময় লিবিয়ায় বিচারিক পুলিশ প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছে আল মাসরি। আবার দেশটির মিতিগায় একটি ‘ভয়ঙ্কর’ কারাগার পরিচালনার জন্যও দায়ী করা হয় তাকে৷ যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আইসিসি তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। গত ১৯ জানুয়ারি তাকে ইটালির উত্তরাঞ্চলীয় শহর তুরিনে আটক করা হয়।
তবে দুদিন পর আল মাসরিকে রোমের আপিল আদালতের সিদ্ধান্তে মুক্তি দেওয়া হয়৷ অ্যামনেস্টি মনে করে, ইটালির বিচারমন্ত্রী কার্লো নর্দিও আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী আল মাসরির গ্রেপ্তারের বিষয়টি আদালতকে নিশ্চিত করেননি।
ওই সময় ইটালির সংবাদমাধ্যমগুলোও লিখেছে, প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণেই আল মাসরির মুক্তির আদেশ দিয়েছে রোমের আপিল আদালত।
বালদাচিনি বলেন, ‘‘ইটালির কাছে এটি করার সুযোগ ছিল [আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ব্যবস্থা অনুসরণ করার] এবং যখন আল মাসরিকে তুরিনে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তখন তারা তা করতে বাধ্যও হতেন। কিন্ত বাস্তবতা হলো, ইটালি তাকে মুক্তি দিয়ে রাষ্ট্রীয় বিমানে চড়িয়ে লিবিয়ায় পাঠিয়েছে।’’
এই মানবাধিকারকর্মী আরো বলেন, ‘‘এটা সত্যিই বেদনাদায়ক যে ইটালি শুধু অভিবাসীদের প্রতি সহিংসতায় জড়িত অন্যতম প্রধান ব্যক্তিকে বিচারের আওতায় আনতে ব্যর্থ হয়েছে তা নয়, বরং লিবিয়ার সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো পুনর্মূল্যায়নেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে।’’
বালদাচিনি আশঙ্কা করছেন, ইটালি যখন ‘‘টিউনিশিয়া এবং মিশরের সঙ্গে অভিবাসন সংক্রান্ত চুক্তি’’ করবে তখনও এই মনোভাবগুলো সেখানে প্রয়োগ করা হতে পারে।
মন্তব্য করুন