শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ২২ চৈত্র ১৪৩১
জাতীয়প্রবাস বাংলাঅপরাধবাণিজ্যরাজনীতিঅন্যান্যসারাদেশমতামতস্বাস্থ্যফিচাররাজধানীপাঠকের কথাআবহাওয়াশিল্প-সাহিত্যগণমাধ্যমকৃষি ও প্রকৃতিইসলামবৌদ্ধহিন্দুখ্রিস্টানআইন-বিচারবিবিধআপন আলোয় উদ্ভাসিতবেসরকারি চাকুরিসরকারি চাকুরি Photo Video Archive

শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ২২ চৈত্র ১৪৩১

জার্মানিতে শরণার্থীদের মধ্যে অপরাধের প্রবণতা কম

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৭:৪৯
ছবি-সংগৃহীত

রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও বাস্তবতা হচ্ছে, অভিবাসন বাড়ার সঙ্গে অপরাধ বাড়ার কোনো সম্পর্ক নেই৷ জার্মানির শীর্ষস্থানীয় একটি ইকোনোমিক পলিসি ইনস্টিটিউটের নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে এই তথ্য৷

জার্মানিতে সংগঠিত অপরাধের পরিসংখ্যান নিয়ে এই গবেষণাটি করেছে আইএফও ইনস্টিটিউট৷ এতে বলা হয়েছে, অভিবাসী বা শরণার্থীদের মধ্যে অপরাধের প্রবণতা উল্লেখ করার মতো নয় এবং কোনো নির্দিষ্ট একটি এলাকা বা জেলায় অবস্থানরত অভিবাসীদের অনুপাত এবং স্থানীয় অপরাধের হারের মধ্যেও কোনো সম্পর্ক নেই৷ 

মিউনিখভিত্তিক ইনস্টিটিউটটি ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সর্বশেষ জাতীয় অপরাধ পরিসংখ্যান নিয়ে এই গবেষণাটি করেছে৷ তারা দেখিয়েছে, অপরাধের পরিসংখ্যানের সঙ্গে অভিবাসীরা কোথা থেকে এসেছেন তার কোনো সম্পর্ক নেই৷

গবেষণায় বলা হয়েছে, অভিবাসীদের মধ্যে শহরাঞ্চলে বসতি স্থাপনের প্রবণতা লক্ষ্যণীয়৷ বিশেষত, যেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি, নাইট লাইফ উপভোগ করা যায় এবং দিনের বেশিরভাগ সময় জনসমাগম থাকে এমন জায়গাতে তারা থাকতে চান৷ ফলে এসব অঞ্চলে অপরাধের হারও বেশি এবং সন্দেহভাজনরা জার্মান কিংবা অভিবাসী অতীত রয়েছে এমন জার্মানও হয়ে থাকেন৷ অন্যদিকে, যেসব জেলা বা অঞ্চলে বেশিসংখ্যক অভিবাসীদের অপরাধে জড়িত থাকতে দেখা গেছে, সেগুলোতেও জার্মানদের অপরাধের হারও বেশি৷

এতে আরো বলা হয়েছে, ‘‘অবকাঠামো, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, পুলিশের উপস্থিতি বা জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে এসব স্থানে অপরাধের ঝুঁকি রয়েছে এবং অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিরা যেকোনো জাতীয়তার বা যেকোনো দেশের হতে পারে৷’’

অপরাধের ঘটনায় কেন অভিবাসীদের দিকেই আঙ্গুল তোলা হয়, তারও একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন গবেষকেরা৷ তারা বলেছেন, জার্মানদের তুলনায় অভিবাসীরা সাধারণত তরুণ বা যুবক বয়সি হয় এবং তাদের বেশিরভাগই পুরুষ৷

অভিবাসীদের প্রতি দায় চাপানোর ক্ষেত্রে এই কারণগুলোকেও সঙ্গতিপূর্ণ বলেও মানতে নারাজ গবেষক দল৷

প্রচলিত আখ্যানের সঙ্গে মিল নেই গবেষণার
সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে জার্মানিতে চলছে নির্বাচনি প্রচার৷ সেখানে জনপ্রিয় ন্যারেটিভ বা আখ্যান হচ্ছে, অভিবাসীদের মধ্যেই অপরাধপ্রবণতা বেশি৷

জার্মান পার্লামেন্ট বুন্ডেসটাগ-এ অভিবাসন সীমিত করার বিষয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কে রক্ষণশীল দল সিডিইউ-এর চ্যান্সেলর প্রার্থী ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস ‘‘আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়মিত গণধর্ষণ’’ নিয়ে কথা বলেছেন৷

অতি-ডানপন্থি রাজনৈতিক দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) প্রতিনিয়ত যেসব কথা বলে আসছে, এসব কথা যেন তাদেরই প্রতিধ্বনি৷ ফেব্রুয়ারির শুরুতে এএফডির বিয়াট্রিক্স ফন স্টর্চ জার্মান পাবলিক ব্রডকাস্টার এআরডিকে বলেন, ‘‘অভিবাসীদের বিশেষত সিরিয়ান, আফগান ও ইরাকিদের কারণে আমাদের এখানে প্রতিদিন দুটি গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে৷ প্রতিদিন দশটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে৷ গত ছয় বছরে গড়ে প্রতিদিন ১৩১টি সহিংস অপরাধের ঘটনা ঘটেছে৷’’

২০২৪ সালে এএফডি নেতা এবং এই নির্বাচনে চ্যান্সেলর প্রার্থী অ্যালিস ভাইডেল বলেছেন, ‘‘আমাদের অপরাধের পরিসংখ্যান আকাশছোঁয়া৷ যুবকদের অপরাধে যুক্ত হওয়া, সহিংসতা মিলিয়ে আকাশছোঁয়া অপরাধ করেছে বিদেশিরা৷’’

তিনি আরো বলেছিলেন, ‘‘ধর্ষণ অনেক বেশি, ছুরি নিয়ে সংঘটিত অপরাধ অনেক বেশি, গত বছরে ছিল ১৫ হাজার৷’’

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই সংখ্যাগুলোর প্রতিটি মিথ্যা৷

মিউনিখ, আশাফেনবুর্গ এবং মাগডেবুর্গের ঘটনায় অভিবাসীদের সংশ্লিষ্টতার বহুল প্রচার অভিবাসী ও অভিবাসনবিরোধী প্রচারের আখ্যানকে আরো জনপ্রিয় করে তুলেছে৷ কিন্তু পরিসংখ্যানগত গবেষণায় উঠে এসেছে একেবারে ভিন্ন চিত্র৷

আইএফও-এর গবেষকেরা বলছেন, ‘‘হত্যা বা যৌন নির্যাতনের মতো সহিংস অপরাধের ক্ষেত্রেও বিদেশি বা শরণার্থীদের সঙ্গে পরিসংখ্যানগত কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়নি৷’’

নতুন কিছু নয়, তবে ভিন্ন
বিশ্লেষক বা একাডেমিকদের মতামতের সঙ্গেও মিল রয়েছে গবেষণালব্ধ এই ফলাফলের৷

গবষেণাপত্রটির সহ-লেখক জঁ-ভিক্টর আলিপুর ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘এই ফলাফল আসলে নতুন কিছু নয়৷’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘শুধু জার্মানির জন্য নয়, অন্য আরো অনেক দেশের জন্য যা আগেই প্রমাণিত হয়েছে, এই গবেষণা সেটিকে আরো একবার প্রমাণ করেছে৷ আর তা হলো: অভিবাসন এবং অপরাধের মধ্যে পদ্ধতিগত কোনো সংযোগ নেই৷’’

জুরিখ ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেস-এর ইনস্টিটিউট অব ডিলিনকোয়েন্সি অ্যান্ড ক্রাইম প্রিভেনশনের অধ্যাপক ডির্ক বেয়ার বলছেন, এই গবেষণাটির নতুন বিষয় হলো, প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার জন্য এখানে অঞ্চলগত ভিন্নতা এবং স্থানীয় তথ্যের উপর বিশেষ দৃষ্টি দেয়া হয়েছে৷

ডিডাব্লিউকে তিনি আরো বলেন, ‘‘এখন পর্যন্ত আমাদের জরিপভিত্তিক গবেষণা ছিল, যেখানে আমরা মূলত তরুণদের তাদের অপরাধমূলক আচরণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি৷ কিন্তু এই গবেষণায় জার্মানির চারশটি জেলার অপরাধমূলক তথ্য নেয়া হয়েছে এবং পারস্পরিক সম্পর্কগুলো যাচাই-বাছাই করা হয়েছে৷’’

আইএফও গবেষকরা বলেছেন, জেলাগুলোর মধ্যে জনসংখ্যাগত তুলনা করে তারা একটি ‘ন্যায্য’ বিশ্লেষণ তৈরি করেছেন৷

গবেষণায় অভিবাসী সম্প্রদায় নিয়ে প্রচলিত ধারণা এবং বাস্তবতার মধ্যে যে ফারাক রয়েছে, গবেষণায় সেদিকটিতেও বিশেষভাবে দৃষ্টি দেয়া হয়েছে৷

আলিপুর বলেন, ‘‘এটি শুধু অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেই সম্পর্কিত নয়, বরং অভিবাসীদের শিক্ষাগত যোগ্যতাকে পদ্ধতিগতভাবে অবমূল্যায়ন করা হয়৷’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘তথ্য-উপাত্ত না দিয়েই নানাভাবে অভিবাসীদের অনেক বেশিমাত্রায় নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়৷’’

এর সম্ভাব্য বেশকিছু কারণ আছে বলে মনে করেন আলিপুর৷ তিনি জানালেন, যেসব অপরাধের সঙ্গে অভিবাসীরা জড়িত রয়েছে, এমন সব খবরগুলো সংবাদমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে এবং দীর্ঘ সময় ধরে প্রকাশিত হয়৷

তিনি বলেন, ‘‘এ কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকিকে অভিবাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে ধরে নেয়া হয়৷ ফলে আরো বেশি সংখ্যক রাজনৈতিক দল এবং সংশ্লিষ্টরা এই ইস্যু থেকে রাজনৈতিক ফায়দা আদায়ের চেষ্টা করেন৷’’

গবেষক দলের সদস্য না হলেও জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডির্ক বেয়ার বলেন, পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যানে অভিবাসীদের বেশি দেখা যাওয়ার বিশেষ কিছু কারণ আছে৷ উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, যখন পুলিশের সামনে একজন জার্মান অপরাধী এবং একজন জার্মান ভুক্তভোগী আসেন এবং যখন একজন অভিবাসী অপরাধী এবং জার্মান ভুক্তভোগী আসেন, তখন জার্মান অপরাধীর তুলনায় অভিবাসী অপরাধীর প্রতি অভিযোগের দায় বেশি চাপানো হয়৷

মন্তব্য করুন