শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১
জাতীয়প্রবাস বাংলাঅপরাধবাণিজ্যরাজনীতিঅন্যান্যসারাদেশমতামতস্বাস্থ্যফিচাররাজধানীপাঠকের কথাআবহাওয়াশিল্প-সাহিত্যগণমাধ্যমকৃষি ও প্রকৃতিইসলামবৌদ্ধহিন্দুখ্রিস্টানআইন-বিচারবিবিধআপন আলোয় উদ্ভাসিতবেসরকারি চাকুরিসরকারি চাকুরি Photo Video Archive

শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১

প্রবাসে কেটে যায় ঈদ, থেকে যায় স্মৃতি

মাহাফুজুল হক চৌধুরী, আবুধাবি, আরব আমিরাত
  ০১ এপ্রিল ২০২৫, ১২:৩১
ছবি-সংগৃহীত

বিদেশ জীবনের টানা ১১তম ঈদ পালন করলাম প্রবাসে। ২০১৫ সাল থেকে কখনো দেশে ঈদ পালন করা হয়নি আমার। তবে এ  নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই, নেই কোনো অনুভূতি, নেই কোনো অভিযোগ। আমি বরাবরই অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা হতে পছন্দ করি। ঈদ আসলে দেড়কোটি প্রবাসীর আকুতি শুনতে পাই। তবে আমি কখনো আকুতি জানাইনি। কখনো কাউকে বলা হয়নি ঈদে আমার খারাপ লাগে, কষ্ট লাগে। 

ঈদ আসলে অন্যরা কষ্ট পেলেও আমি আনন্দ খোঁজার চেষ্টা করি। অন্যরা কষ্ট পায় কারণ ঈদটাকে তারা উপলব্ধি করে, যখন তারা তাদের মনের সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারে না! যেমন তাদের ইচ্ছে করে পরিবারের সাথে ঘুরবে, বউ বাচ্চা মা-বাবার মুখ দেখবে যখন সেটি করতে পারে না তখনি তারা কষ্ট পায়।

আর যার কোনো আকাঙ্ক্ষাই থাকে না তার ত কষ্ট পাওয়ারও কিছু থাকে না। আমার কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই, ঈদ আসলে আমার আলাদা কোনো অনুভূতি কাজ করে না যার ফলে আমি কষ্ট না পেয়ে আনন্দ খুঁজি। 

প্রবাস জীবনে যে বছর প্রথম ঈদ পালন করেছি সে বছর বরাবরের মতই বাংলাদেশের আমেজ উপলব্ধি করতাম, যখন দেখলাম ঈদের দিনেও কাজ থেকে ছুটি পাইনি, ঈদের জন্য কোনো নতুন জামা কিনতে পারিনি সেদিনই প্রবাস জীবন কি তা আর বুঝতে বাকি রইল না। তবে ঈদের দিন ছুটি না পাওয়ার কারণ হল—আমার প্রবাস জীবন শুরু হয়েছে ইউরোপের দেশ
সাইপ্রাসে। 

সাইপ্রাস খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী দেশ হওয়ায় সেদেশে মুসলমানদের ধর্মীয় কোনো উৎসবে সরকারি বন্ধ দেওয়া হয় না। আমি জানতাম না এদেশের এ রকম সিস্টেম। আমি তখন গাড়ির ওয়ার্কশপের কাজ করতাম সাইপ্রাসের রাজধানী নিকোশিয়ার ফ্যাক্টরি এরিয়াতে। আমার দেশের বাড়ি চট্টগ্রামের চন্দনাইশে। 

ভেবেছিলাম মালিক থেকে ঈদের দিন ছুটি চেয়ে নেব, কিন্তু ঈদের দুইদিন আগ থেকে কাজের এতটাই চাপ ছিল যে তার কাছে
যে ছুটি চাইব সে পরিস্থিতি আমার ছিল না। রাতে পরিকল্পনা করি ঈদের নামাজ আর পড়া হবে না। কারণ আমি যেখানে কাজ করি ওখান থেকে মসজিদ প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু রাতে কয়েকজন বন্ধুদের অনুরোধে ভোরে উঠে পুরাতন জামা পড়ে বাসে করে চলে গেলাম রাজধানী নিকোশিয়ায় নামাজ পড়তে।
 
কিন্তু নামাজ শেষ করে কিছুতেই আর কাজে ফিরতে ইচ্ছে করছে না। বন্ধুরা ডেকে নিয়ে গেল বাসায়। তারা রান্নাবান্না করছে আমাকে না খেয়ে আসতে দিচ্ছিল না, কিন্তু যখন সকাল ৯টা বাজে মালিকের ফোন আর ফোনে বিরক্ত হয়ে খাবার দাবার না খেয়েই চলে আসতে হয়েছে কাজে।

রাগ করে আর বাড়িতেও কাউকে ফোন দিয়ে বলিনি যে এ কষ্টের কথা। কিন্তু তারা ধরে নিয়েছিল আমি অনেক আনন্দ করছি বিদেশে। পরের বছর থেকে আর কখনো এটা নিয়ে আক্ষেপ করিনি তবে আমার ৬ বছর সাইপ্রাস জীবনে একবার ছুটি পেয়েছিলাম ঈদের দিন, কারণ সেদিন ছিল রবিবার। সাইপ্রাসে রবিবারে সরকারি ছুটি। সাইপ্রাসে এভাবে আমার মত প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশির একই অবস্থা। কারো মনে কোনো ঈদের আনন্দ নেই। 

এরপর ২০২০ সালের শেষের দিকে চলে আসলাম আরব আমিরাতে। এখানে এসে বড় ভাইয়ের কন্সট্রাকশন ঠিকাদারি কোম্পানিতে জয়েন করলাম। এখানে এসেই ঈদের নতুন করে অনুভূতি হতে লাগল। কারণ এখানে এসেই ঈদের দিন পরিবারের মা, ভাই ও ভাইয়ের পরিবারকে পেয়েছিলাম। আমিরাতের প্রথম ঈদ কেটেছে আমার কাছে অনেক আনন্দের। মনে হয়েছিল আমি দেশেই ঈদ করছি।
 
ঈদের সময়টা নিজের পরিবারের সাথে কাটাতে পারার মাঝে কি এক প্রশান্তি তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমার কাছে ইউরোপ আর মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসীদের মাঝে অনেক তফাৎ মনে হয়। ইউরোপ প্রবাসীরা অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হয় তারা চায়লেও দেশে যেতে পারে না যেভাবে মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসীরা চায়লে দেশে পারে। 

কত মানুষ দেশে ঈদের আগে স্বজন হারিয়ে ফেলে, কত অসহায় মানুষ দেশে ঈদ করতে পারে না। কত মানুষ পরিবার থেকে দূর দূরান্তে কাজ করার কারণে ঈদে বাড়ি যেতে পারে না। কিন্তু আমরা কি কখনো তাদের কথা ভেবেছি? তারা হয়ত প্রবাসী নয় কিন্তু তারাও ত আমাদের মত কষ্টের ভাগিদার। শুধু প্রবাসীদেরকেই সহানুভূতির চোখে তাকাতে হবে তা আমি একজন প্রবাসী হয়েও
সমর্থন করিনা। বরং আমরা সেসব মানুষ থেকে ভাল আছি। অন্তত আমাদের আত্মতৃপ্তি পাবার মতো একটা বিষয় আছে। আমরা তাদের চেয়ে বেশি টাকা ইনকাম করি, তাদের চেয়ে ভাল অবস্থানে আছি। 

আসলে পৃথিবীটা কারো জন্যই পুষ্পসহ্যা নয়, ঈদটা কেবল তারই একটা অংশ। এটাতে আলাদা করে কষ্ট পাবার কিছু দেখি না
আমি। যাইহোক, এভাবে কেটে গেল অনেকগুলি ঈদ। এবারের ঈদে প্রথমদিন ঘুমিয়ে আর মোবাইলে কথা বলে কাটালেও পরেরদিন একটু দূরে গেলাম ভাই আর বন্ধুদের সাথে ঘুরতে। কারো চোখেমুখে হতাশার চাপ নেই। হয়ত তারাও আমার মত 
নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। এভাবে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারলে ঈদের দিনে আলাদা করে প্রবাসীদের আর কষ্ট পেতে হবে না।

মন্তব্য করুন