দিনটি ছিলো জুলাইয়ের ২০। স্বৈরাচারী শেৃখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তখন তুঙ্গে। আন্দোলন দমাতে সরকার কারফিউ জারি করেছে। সেদিন ছিল কারফিউর প্রথম সকাল। বাসার সামনে বাটার গলিতে নাশতা খেতে বেরিয়েছিলেন সবুজ।
আর ফেরা হয়নি তার। পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছেন তিনি।
৪২ বছরের কামাল হোসেন সবুজ থাকতেন রাজধানীর বাড্ডার শাহজাদপুরে। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আইয়ের গাড়ি চালাতেন গত ১৮ বছর ধরে।
সেদিন সকালে লুঙ্গি পরে নাশতা খেতে বাসা থেকে বের হন। বের হয়েই দেখেন গোলাগুলির হচ্ছে। মোবাইল ফোনে কয়েক সেকেন্ড ভিডিও করেন।
প্যান্ট পরে আবার বের হবেন এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে যখনই ফিরতে যাচ্ছিলেন, তখনই একটি গুলি এসে তার মাথার খুলি দু’ভাগ করে দিলে মগজ বের হয়ে যায়।
সঙ্গে থাকা একজন শত শত গুলি উপেক্ষা করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু কর্তৃপক্ষ ভর্তি করেনি। এক পর্যায়ে তিনি মারা যান তিনি।
সবুজের বড় ছেলে সামিউল ঝালকাঠি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। ৫ বছরের মেঝো ছেলে আবদুল্লাহ বাবার আইডি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে সারাক্ষণ ছোটাছুটি করে। ছোট্ট মেয়েটির ৩ বছর পূর্ণ হলো ২৫ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ বাবার মৃত্যুর এক মাস পরে।
কামাল হোসেন সবুজের বাড়ি ঝালকাঠি সদর উপজেলার বিনয়কাঠি ইউনিয়নের বালকদিয়া গ্রামে। সত্তরোর্ধ বাবা মুনসুর হাওলাদার স্ট্রোক করে প্যারালাইজড হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন কয়েক বছর ধরে।
মা মাহমুদা বেগম মারা যান আরও ৩০ বছর আগে। ৪ ভাইবোনের মধ্যে সে ছিল তৃতীয়। পরিবারে আছেন আরও দুই ভাই ও এক বোন। এক ভাইয়ের একটি দোকান আছে আর অন্য ভাই পিকআপ গাড়ি চালান। একমাত্র বোনকে বিয়ে দেয়া হয়েছে পাশের গ্রামেই।
১৯৮১ সালের ২ জানুয়ারি জন্ম নেয়া সবুজের বিয়ে হয় ২০০৮ সালের ২৯ জুলাই ঝালকাঠি সদর উপজেলার বাসন্ডা ইউনিয়নের আগরবাড়ি গ্রামের কৃষক ইসমাঈল হাওলাদারের মেয়ে সাদিয়া বেগম রানির সঙ্গে।
রানি বলেন, আমার স্বামীকে বিজিবি গুলি করে মেরেছে। আমার ছোটোভাই খবর পেয়ে দ্রুত সেখানে ছুটে যান। সকাল ৯টায় আমি ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে গেলে আমার মোবাইলে একটি মিস কল আসে। আমি কল ব্যাক করলে উত্তরে জানানো হয় ‘ভুল নম্বরে ফোন দিয়েছেন’। কথার এক পর্যায়ে ‘নাশতা খেতে বের হয়ে গুলি খেয়েছে’ বলেই সংযোগটি কেটে দেয়।
আমি তখন ভেবেছি আমাদের বাসা থেকে হয়তো বড় ছেলে নাশতা খেতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছে, কারণ ঝালকাঠিও সেদিন কারফিউতে ছিল উত্তপ্ত। ২০ মিনিট পরে আবার ফোন আসলে জিজ্ঞেস করা হয় ‘কে আপনি? কামালের কী হন?’ আমি তখন ইচ্ছে করেই পরিচয় গোপন করে বলি, ‘আমি তার চাচাতো বোন, আমার কাছে বলেন, কামালের কী হয়েছে?' আর তখনই জানতে পারি আমার স্বামী আর নেই!
১৯ জুলাই রাত সাড়ে এগারটায় শেষ কথায় সে আমাকে বলেছিলো ‘দেশের যে অবস্থা, চাকরি থাকে কি না? চাকরি চলে গেলে সংসার চলবে কীভাবে? ছোট মেয়েটি বাবার কাছে আম খেতে চেয়েছিল। এর জবাবে মেয়েকে সে বলেছিল আমি তোমার জন্য আম নিয়ে আসব। সে আসলো ঠিকই, তবে লাশ হয়ে। নিথর বাবাকে পেয়ে মেয়েটা বার বার আমের কথা জিজ্ঞেস করছিল!
সাদিয়া বেগম রানি বাসসকে আরও বলেন, যে পথচারী সবুজকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনিই সেখান থেকে মৃতদেহ শাহজাদপুরের একটি মাদরাসায় নিয়ে যান। আর সেখানে একজনের করা ভিডিও দেখে ওনার (সবুজের) বাসার কেয়ারটেকার তাকে চিনতে পারেন। এরপর শাহজাদপুরের ওই মাদরাসায় আমার স্বামীর গোসল ও জানাজার ব্যবস্থা করা হয়।
২০ জুলাই সন্ধ্যা ৭টার পরে ঝালকাঠি সদর উপজেলার বাসন্ডা ইউনিয়নের আগরবাড়ি গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে সবুজের মরদেহ নিয়ে আসা হয়। সেদিন ছিলো প্রথম কারফিউ। গ্রামের কর্দমাক্ত সরু রাস্তায় রাতের অন্ধকার কাটাতে গাছে গাছে বাধা হয় টিউবলাইট। প্রত্যেকের চোখেমুখে ছিলো ভীতির ছাপ।
শেষবারের মতো যে উঠোনে রাখা হয় সবুজের মরদেহ, সেই উঠোনে সারাক্ষণ ছুটছে তার শিশু সন্তানরা। আপন মনে দুরন্তপনা করে যাচ্ছে, কিন্তু এই উঠোনে বা এই গ্রামে আর কোনোদিন এই শিশুরা বাবার হাত ধরে বেড়াতে আসবে না। সবুজকে দাফন করা হয় শ্বশুরবাড়িতে অর্থাৎ ঝালকাঠি সদর উপজেলার বাসন্ডা ইউনিয়নের আগরবাড়ি মসজিদের কবরস্থানে।
ছেলে সামিউল বলেন, আমি আমার বাবা হত্যার বিচার চাই। আমি কেন এই বয়সে আমার বাবাকে হারালাম। বাবাই আমাদের সংসারে একমাত্র ভরসা ছিল। এখন আমাদের দেখার কেউ নেই। আমার আশা, বাবার হত্যার বিচার এই জাতি করবে।
সাদিয়া বেগম রানি বাসসকে আরও বলেন, আমরা এখন ছেলের পড়াশোনার জন্য ঝালকাঠি শহরের বউবাজার এলাকায় চার হাজার টাকায় একটি ভাড়া বাসায় ৩ সন্তান নিয়ে বসবাস করি। ২০ জুলাই সামিউলের বাবার লাশ আসার পর থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ১৬ দিন আমাদের সাথে কেউ তেমন একটা কথা বলত না। এড়িয়ে চলত। আমাদের সরকার বিরোধী ভাবত।
শেখ হাসিনার পতনের পর ৬ আগস্ট থেকে সব পাল্টে যাওয়া শুরু করে। হাসিনা সরকার পালিয়ে গেলে অনেকে আমাদের খোঁজ-খবর নেওয়া শুরু করে। দেশের জন্য আমার স্বামী জীবন দেয়ায় এখন অনেকেই আমাদেরকে সম্মানের চোখে দেখা শুরু করলেও স্বামীর মৃত্যুতে এখন আমার জীবন শুধুই অন্ধকার। কীভাবে সংসার চালাব আর কীভাবে সন্তানদের মানুষ করব?
ঝালকাঠি জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ২ লাখ ও বড় ছেলের পড়াশোনার জন্য আসসুন্নাহ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে এক লাখ টাকা দেয়া হয়েছে আমাদেরকে। কিন্তু এ টাকায় আমাদের চারজনের পরিবারের কয়দিন চলবে? সরকারের পক্ষ থেকে আমরা এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের সহায়তা পাইনি।
তিনি বলেন, আমি যেহেতু দশম শ্রেণি পর্যন্ত লেখা পড়া করেছি তাই সরকার যদি আমাকে একটা চাকরি দেয় তাহলে ছেলে-মেয়ে নিয়ে কোনমতে জীবন চালিয়ে যেতে পারব।
ঝালকাঠি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানা ইয়াসমিন বাসসকে বলেন, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বিভিন্নস্থানে নিহত ঝালকাঠি সদরের বাসিন্দাদের এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো আর্থিক সহায়তা করা হয়নি। কেন্দ্রীয়ভাবে গঠিত তহবিল থেকে নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করা হবে।
নিজের বাবার বাড়িতেই স্বামীকে শেষ বিদায় দিয়েছেন স্ত্রী সাদিয়া বেগম রানি। স্বামীর শেষ যাত্রার সেই খালপাড়েই বাবার বাড়িতে প্রায়ই সন্তানদের নিয়ে ছুটে আসেন সব ভুলে থাকতে। কিন্তু জুলাইকে ভুলবেন কি করে!
মন্তব্য করুন