শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ৫ আশ্বিন ১৪৩১
জাতীয়প্রবাস বাংলাঅপরাধবাণিজ্যরাজনীতিসারাদেশমতামতস্বাস্থ্যরাজধানীপাঠকের কথাআবহাওয়াফিচারশিল্প-সাহিত্যগণমাধ্যমকৃষি ও প্রকৃতিইসলামবৌদ্ধহিন্দুখ্রিস্টানআইন-বিচারবিবিধআপন আলোয় উদ্ভাসিতবেসরকারি চাকুরিসরকারি চাকুরি Photo Video Archive

শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ৫ আশ্বিন ১৪৩১

এই জীবন যেন গোলকধাঁধা

উজ্জ্বল হোসাইন
  ০২ এপ্রিল ২০২৪, ১০:৪৬

কপোল ভিজে গেল নয়নের জলে-এই চরণ বার বারই মনে পড়ে। আসলে কিছু অব্যক্ত কথা, না পাওয়ার যন্ত্রণাই মানুষকে কষ্ট দেয়। হয়তো অনেকে ভাববে উল্টাপাল্টা বলছে। হয়তো কপোল উপরে, নয়ন নিচে কিভাবে ভিজবে এটা প্রশ্ন থেকে যায়। জীবনে চেষ্টা করছি দূর্গম পথ পাড়ি দিতে কতটা পাড়ি দেয়া যায় সেটাতো রবের হাতে। আবার কিছু স্বপ্ন পূরণে অবশ্যই বয়স একটা ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। সব ঝিনুকে মুক্তা মিলে না, তবে যিনি এই মুক্তা সংগ্রহ করেন তিনি সবই কুড়ান। আবার ঠিকমতো যত্ন করেন যেন ধুলোবালিতে নষ্ট না হয়। সে জানে সবচেয়ে দ্রুতগামী সিংহের চেয়ে দ্রুত দৌড়াতে হবে, নইলে তাকে মরতে হবে। অন্য দিকে তার মনে প্রতিদিন সকালে একটি সিংহও জাগছে। সে জানেও, হরিণের চেয়ে দ্রুত না দৌঁড়ালে তাকে মরতে হবে। আপনি/আমি হরিণ না সিংহ, সেটা আমরা জানি না। এ রকম জটিল পরিস্থিতিতে বিভ্রান্ত হওয়া স্বাভাবিকই। এখন আমার দু’চোখ দিয়ে দু’ভাবে দেখছি। আবার গভীরভাবে ভাবছি, কী করব বা কী করা উচিত? চোখেমুখে প্রবল ঘোর কাজ করছে। প্রতিক্ষণে ভাবছি জীবনের সব কালো কবে আবার আলোকিত হবে? কেন জানি, দু’নয়ন দিয়ে একরকম দেখি না। বিভ্রান্তি আমাকে এবং সবাইকে গ্রাস করে ফেলেছে। কি করবো, কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। চলতে হবে আরো বহুদূর।

হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলো। নিজেকে খুব হালকা মনে হচ্ছে। তাহলে কঠিন অসুস্থতা হয়তো বিদায় নিলো। নিজেকে কতোদিন বাইরের সাথে সাক্ষাত নেই। অনেক কিছুই অচেনা মনে হচ্ছে। যাক তারপরও যেতে হবে। এভাবে কয়েকদিন বাড়িতে থেকে সুস্থ হয়ে ফিরে গেলাম কঠিনতম জায়গা। যেখানে পড়াশোনার জন্য থাকতে হবে। তবে যেকোনো কঠিন অসুখ মায়ের সেবায় কারণে মুক্তি মেলে। মায়ের মুখ যেনো পৃথিবীর সেরা দাওয়াই। অসুস্থতার মধ্যে মা যে কি পরিমাণ সেবা করেছেন সেটা উপলব্ধি করলাম।

মাকে বললাম, মা আমারতো অসুস্থতার কারণে অনেকদিন বন্ধ হয়ে গেলো কি করবো। মা বললো আর কয়েকটা দিন থেকে যা বাবা। আমি মাকে বললাম, মা আমার যেটুকু অসুস্থতা আছে সেটা স্কুলে গেলেই সেরে যাবে। তাই মায়ের মন যেতে দিতে না চাইলেও সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে মা বুঝতে পারে। তার সন্তান কি করলে ভালো থাকবে। তাই দেরিতে হলেও মা রাজি হলেও যেতে দিতে। আবার সেই বহুক্রোশ পথ পাড়ি দিয়ে ফুফুর বাসায় চলে এলাম। এসেই শুরু হলো দিগুণ উদ্যোমে পড়াশুনা। কিছুদিন যেতে না যেতে ফুফুর সংসারে ফুফাতো ভাইদের মধ্যে পারিবারিক সমস্যা শুরু হলে আমাকে ভিন্ন পথ অবলম্বন করতে হলো। আমি তখন ক্লাস ফাইভে উঠেছি। এ অবস্থায় আমার পড়াশুনা বন্ধ হবে। না এটা হতে দিবো। সহপাঠিদের সাথে বিষয়টি আলোচনা করতে অনেক সহপাঠি বললো আরে বন্ধু তুই আমাদের বাড়িতে থেকে পড়াশুনা করবি। কিন্তু সেটা কি সম্ভব। না আমাকে অন্য পথ বেছে নিতে হবে।

পাশেই দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা হলো। সম্পর্কে তারা মামা (আমার চাচার শ্যালক) হন। সেই মামার তিন সন্তানকে পড়াতে হবে। সবচে’ ছোটটার বয়স তিন বছর। বড়জন আমার চেয়ে এক ক্লাসের ছোট আবুল হোসেন, পরেরজন ইমাম হোসেন, ছোটজন দিদার হোসেন। তিন হোসেন পড়াতে আমার খুবই ভালো লাগতো। মামা মুদি ব্যবসায়ী ছিলেন। তাই মামা নিজেই সন্তানদের পড়াশুনার ব্যাপারে বেশ আগ্রহী ছিলেন। তাই ফুফুর বাড়ির পাশেই সেই মামার বাসায় ঠাঁই হলো। ফুফুর বাড়িতে কষ্ট হলেও নিজেদের বাড়ির মতোই মনে হতো। কিন্তু মামার বাড়িতে তেমন কষ্ট নেই। তারা আমাকে সবসময় মেহমানের মতোই আপ্যায়ন করতো।

কিন্তু এখানে ভিন্ন রকম একটা জীবন। তবে আমাকে ফুফুর বাড়ির মতো কষ্টটি করতে হতো না। তাই ফুফুর বাড়ির পাশে মামার বাড়িতেই লজিং মাস্টার হয়ে গেলাম। মাঝে মাঝে মনে মনে রাগ হতো এতো কষ্ট করে কি পড়াশুনা করা যায়। কিন্তু মনের ভেতর অন্য রকম একটা মন আছে তাকে কিভাবে বাঁধা সে মনতো বলে না তোমাকে পড়াশুনা করতেই হবে। ওই অঞ্চলে তখন বিদ্যুতের আলো কি সেটা বই পুস্তকেই পড়তাম। সন্ধ্যা হলেই কেরোসিনের প্রদীপ রেডি হতো জ্বালানো জন্য। অনেকে আবার হারিকেন ব্যবহার করতো। তবে হারিকেনের আলোতেই আমার পড়তে বেশি ভালো লাগতো। এভাবে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে ফেলি। বাড়িতে ফিরে এলে মা বললো, তোকে আর তারাবুনিয়া থেকে পড়াশুনা করতে হবে না। এরপর লালপুরে তোর মামার বাড়িতে থাকবি। আমি আনন্দে আত্মহারা। ছোটবেলা মামা বাড়িটা অনেক মজার ছিলো। বইয়ে যেভাবে পড়েছিলাম ঠিক সেরকমটিই ছিলো আমার মামা বাড়ি।

আয় ছেলেরা, আয় মেয়েরা,

ফুল তুলিতে যাই

ফুলের মালা গলায় দিয়ে

মামার বাড়ি যাই।

মামার বাড়ি পদ্মপুকুর

গলায় গলায় জল,

এপার হতে ওপার গিয়ে

নাচে ঢেউয়ের দল।

মা যেহেতু পাঠাতে চায় তাহলে খারাপ হবে না। আর মামাতো ভাই-বোন যারা আছে তাদের সাথে সময়টা ভালোই যাবে। কিছুদিন আমার ছোট মামা আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। মায়ের কাছ থেকে শুনে মামা বললো ভাগিনাকে আজকেই নিয়ে যাবো। মামা মাকে বললো আমাদের এখানে ভালো স্কুল আছে সেখানে পড়াশুনা ভালো হবে। আর যেহেতু শহর থেকে খুব বেশি দূরে নয় তাই ওখানে ভালোভাবে পড়াশুনা করতে পারবে।

মনেও মধ্যে অজানা এক কৌতুহল জন্ম নিলো। নতুন সহপাঠিদের সাথে মিশবো, বন্ধুত্ব হবে। কিন্তু মনের কোনো একটা ব্যাথা অনুভব হতো। প্রাথমিক বন্ধুদের কথা ভাবতে ভাবতে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বন্ধু মনির খান, ইদ্রিছ আলী, হারুনুর রশিদ, আল-আমিন সুমন, ফারুকসহ আরো অনেক বন্ধু আছে তাদেরকে খুব মিস করবো। এসব বন্ধুদের সবচে ঘনিষ্ঠ ছিলো বন্ধু মনির খান। আমার এই বন্ধুর কথা লিখলে অনেক লিখা যাবে। বন্ধু মনিরের সাথে আলাপ করলে সেও বললো আমিও চাঁদপুর চলে যাবো। তখন ভাবলাম সে যেহেতু চাঁদপুর যাবে আমি লালপুর তাহলে যোগাযোগ থাকবে। পড়ে বন্ধু মনিরের পড়ালেখার জন্য চাঁদপুর আসতে দেরি হলেও আমি কিন্তু লালপুরে চলে আসি। মামা বাড়িতে অন্য সময় আসলে নিজেকে মেহমানের মতো মনে হলেও এবার আসার পর কেনো জানি মেহমানের মতো মনে হলো। অন্য সময় বছরে ৪-৫ বার মামা বাড়ি আসতাম। আর এখন পড়াশুনার তাগিদে মামা বাড়ি স্থায়ী হয়ে গেলাম। ছোট মামা (সিরাজ মাঝি) সবসময় আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতেন এই হলো আমার আদরের ভাগিনা। ও পড়াশুনায় মেধাবী আমাদের কাছে থাকবে।

লালপুর থেকে প্রায় এক থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে আমিরাবাদ গোলাম কিবরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় (আমিরাবাদ জিকে উচ্চ বিদ্যালয়)। সেখানে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করিয়ে দিলো। মামা স্কুলে নিয়ে গেলো আমাকে। ইট পাথরের সাজানো গোছানো একটি স্কুল। পূর্ব দিকে বিশাল সবুজে ঘেরা মাঠ। প্রথম দেখাতেই স্কুলটি ভালো লেগে গেলো। তবে সমস্যা ছিলো সেই লালপুর থেকে পায়ে হেঁটে স্কুলে যাওয়া। গ্রীষ্মকালে স্কুলে যেতে সমস্যা না হলেও বর্ষাকালে মাঝে মাঝে সমস্যা হতো। কারণ মামা বাড়িটি ছিলো মূল রাস্তা থেকে একটু দূরে। বর্ষাকালে সাধারণ খেয়া নৌকা বা কারো কারো নিজস্ব নৌকা দিয়ে মূল রাস্তায় নেমে সেখান থেকে স্কুলে যেতে হতো। তখনকার দিনে ছাত্র-ছাত্রী কেউ স্কুল ব্যাগ করতো না। বই হাতে নিয়ে দূরে স্কুলে যেতে হতো।

প্রথম প্রথম মামা বাড়িতে আদর যত্নের অভাব হতো না। মেঝো মামা হানিফ মাঝি, বড় মামা মোস্তফা মাঝি আর ছোট মামা সিরাজ মাঝি, তিন মামার মধ্যে দুই মামা বিয়ে করে অনেক আগে সংসারি হয়েছেন। আর আমার নানি, যার ছায়াতলে জীবনের স্বর্ণালি সময়টা কেটেছে। ছোট মামা সবার ছোট ছিলেন তাই সবসময় সকলের আদরের ছিলেন। মামার বংশের সবাই নৌকার মাঝি ছিলেন। তাদের বিশাল বড় বড় নৌকা (ঘাসি) ও ট্রলার ছিলো। এসব নৌকা ও ট্রলারে নদীপথে ঢাকা থেকে চাঁদপুর পুরাণবাজার ব্যবসা কেন্দ্রে মালামাল পরিবহন করতেন। নানুর কাছে গল্প শুনতাম আমার নানারা এক সময় গুণ টেনে চাঁদপুর থেকে ঢাকা যেতেন। কারণ সে সময় ইঞ্চিন চালিত নৌযান ছিলো না। এ রকম অনেক গল্প নানু আমাকে শোনাতেন আর আমি নানুর পাশে শুয়ে সারারাত এসব গল্প শুনতাম। কত রকম গল্প নানু শোনাতেন আর এই গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পরতাম।

মামা বাড়িটি খুব সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্যে ঘেরা ছিলো। চারপাশে বাড়ি ছিলো আর মাঝখানে বিশাল পুুকুর। এই পুকুরে শৈশবের বেশিরভাগ সময় সাঁতার কেটেছি। পুকুরের চারপাশে আমার মামাদের বংশের লোকজনই বেশি ছিলো। আর অন্য যারা ছিলেন তারাও আমাকে ভাগিনা হিসেবেই জানতো। আর আমাকে সবাই আদর করে ভাগিনা বলেই ডাকতো। গ্রামের পাশ দিয়ে মেঘনা নদী বয়ে গেছে। কখন নদীতে আবার কখনও পুকুরে গোসল করতাম। একটু দূরে লালপুর বাজার ছিলো। লোকমুখে শোনা গেছে এই লালপুর বাজার এতোটাই জনপ্রিয় ছিলো এক সময় নর্থবেঙ্গল থেকে স্টিমার এসে এখানে ভিড়তো। তবে সেই ঐতিহ্য না দেখলেও লালপুর বাজার ছিলো বাঁশের জন্য বিখ্যাত। সপ্তাহে শনি ও মঙ্গলবার বাজার বসতো। নদীপাড়ে সারি সারি বাঁশের আড়ৎদার ও ক্রেতাদের সমাগত হতো। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে লোকজন আসতো বাঁশ ক্রয়ের জন্যে।

অল্প কিছুদিনের মধ্যেই অনেক বন্ধু হয়ে গেলো। আর সেই যে বন্ধু মনির খান তার সাথে চিঠি দিয়ে যোগাযোগ হতো। বন্ধু মনির লিখতো একপাশ থেকে আর অন্য পাশে আমি অপেক্ষায় থাকতাম কখন পোস্ট মাস্টার চিঠি দিয়ে যাবে। বন্ধু মনিরের চিঠি পেয়ে আবার আমি ফিরতি চিঠি পাঠাতাম। পাড়ার সকলের কাছে অল্পকিছু দিনের মধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে উঠলাম। আর এই জনপ্রিয় হয়ে উঠার পেছনে কারণ ছিলো অনেক। পড়াশুনায় মেধাবী, চলনে বলনে সহজ-সরলতার ছাপ, খেলাধুলায় তুখোড়। খেলার মাঠে আমি না গেলে জমে উঠতো না...।

 

মন্তব্য করুন