বাড়িটার সামনে একটা পুরোনো পাকা গাছ, যেখানে প্রতিদিন বিকেলে বসে থাকেন মতিজান বেগম। বয়স ষাটের কাছাকাছি, চোখে গভীর মায়া আর মুখে সারল্যের ছাপ। এই বাড়িটা একসময় তার গর্ব ছিল, তার স্বপ্নের ঠিকানা। কিন্তু এখন?
এখন সে কেবল অতীতের স্মৃতির সাথে বেঁচে আছেন।
এক সময়ের সরল-সাদাসিধে গৃহবধূ, যিনি নিজের সবকিছু উৎসর্গ করেছিলেন একমাত্র ছেলের জন্য। স্বামী মারা যাওয়ার পর সব দায়িত্ব ছিল তার কাঁধে। তিনি অন্যের বাসায় কাজ করে, সেলাই করে ছেলেকে মানুষ করেছেন, ভালো স্কুলে পড়িয়েছেন, তার স্বপ্ন পূরণ করেছেন।
ছেলে তানভীর এখন বিদেশে বড় চাকরি করে। প্রথম দিকে ফোন করত, টাকা পাঠাত, খোঁজ নিত। কিন্তু ধীরে ধীরে ফোন কমতে লাগল, খোঁজ নেওয়াও কমে গেল। মা নিজে ফোন দিলে বলত, “মা, খুব ব্যস্ত, পরে কথা বলব।”
কিন্তু সেই “পরে” আর কখনো আসেনি।
একদিন তানভীর দেশে ফিরল। তবে মায়ের জন্য নয়, এসেছিল তার পুরোনো বাড়ি বিক্রি করার জন্য। মা জানতে পারলে হাসলেন, বললেন,
— “বাড়িটা বিক্রি করবি? তোর কোনো আপত্তি নেই?”
— “না মা, এখন শহরে ফ্ল্যাট ছাড়া চলে না। তুমি চাইলে আমিও তোমাকে নিয়ে যেতে পারি।”
মা এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর চোখ মুছে শুধু বললেন,
— “না বাবা, আমি এখানেই থাকব।”
তানভীর কিছু বলল না। কয়েক দিনের মধ্যেই বাড়িটা বিক্রির কাজ শুরু করল। মা দেখলেন, প্রতিটা দেয়াল, প্রতিটা কোণা যেখানে তার অগণিত স্মৃতি লুকিয়ে আছে, একদিন অন্য কারো হয়ে যাবে।
অবশেষে বিক্রির দিন এলো। তানভীর কাগজে সই করল, টাকা হাতে পেল। মা চুপচাপ বসে ছিলেন। ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “তুই খুব বড় হয়ে গেছিস, বাবা।”
— “কেন মা?”
— “কারণ আমি তোকে মানুষ বানানোর জন্য সবকিছু হারিয়েছি, কিন্তু তুই আমাকে হারিয়ে সবকিছু পেয়েছিস।”
তানভীর কিছু বলার সাহস পেল না। সে জানত, এই কথার কোনো জবাব নেই।
সেদিন বিকেলে মতিজান বেগম আবার গাছের নিচে এসে বসলেন, ঠিক প্রতিদিনের মতো। কিন্তু আজ তিনি জানতেন, এটা তার নিজের বাড়ির আঙিনা নয়—শুধু স্মৃতির শেষ আশ্রয়।
শেষ কথা:
আমরা জীবনে অনেক কিছু অর্জন করি, কিন্তু যারা আমাদের জন্য নিজেদের সবকিছু হারিয়েছে—তাদের কি আমরা ভুলে যেতে পারি?
আজ যারা বাবা-মায়ের জন্য ব্যস্ততার অজুহাত দেখাই, তাদের কি মনে আছে—তারা কিন্তু আমাদের জন্য সব ব্যস্ততা ভুলে ছিলেন!
মন্তব্য করুন