বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ২০ চৈত্র ১৪৩১
জাতীয়প্রবাস বাংলাঅপরাধবাণিজ্যরাজনীতিঅন্যান্যসারাদেশমতামতস্বাস্থ্যফিচাররাজধানীপাঠকের কথাআবহাওয়াশিল্প-সাহিত্যগণমাধ্যমকৃষি ও প্রকৃতিইসলামবৌদ্ধহিন্দুখ্রিস্টানআইন-বিচারবিবিধআপন আলোয় উদ্ভাসিতবেসরকারি চাকুরিসরকারি চাকুরি Photo Video Archive

বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ২০ চৈত্র ১৪৩১

নিঃশব্দ কান্না

হাফেজ মাহাথির মোহাম্মদ
  ২৪ মার্চ ২০২৫, ১৯:০৫

শীতের সকাল। ঘন কুয়াশায় ঢেকে আছে চারপাশ। একটা ছোট্ট জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে তৃষা। প্রতিদিনের মতো আজও সে চুপচাপ বসে আছে। মুখে কোনো শব্দ নেই, ঠোঁটে কোনো কথা নেই। কারণ সে বোবা।

তৃষার জন্মের পর থেকেই সবাই তাকে এক অভিশাপ মনে করত। মা যখন মারা গেল, তখন মাত্র তিন মাস বয়স ছিল তার। লোকজন বলত, "এই মেয়েটাই ওর মায়ের মৃত্যু ডেকে এনেছে!" বাবা তাকে কখনোই ভালোবাসতে পারেনি। বরং তৃষার দিকে তাকালেই চোখে ঘৃণার ছায়া ফুটে উঠত।

তৃষা কোনোদিন কারও ভালোবাসা পায়নি। বাবার বাড়িতেও নয়, স্কুলেও নয়। স্কুলে সে একা বসত, কেউ তার পাশে বসতে চাইত না। সহপাঠীরা তাকে ব্যঙ্গ করত, বলত—"এ তো একটা বোবা পুতুল!" কেউ কেউ তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিত, মাটিতে লিখে বলত, "আমাদের সঙ্গে খেলতে হলে কথা বলতে হবে!"

তৃষা কখনো কথা বলতে পারেনি। শুধু ভেতরে ভেতরে কষ্ট চেপে রেখেছে।

তন্ময়ের আগমন

তৃষার জীবন বদলাতে শুরু করেছিল তন্ময়ের আসার পর।

তন্ময় ছিল সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা এক তরুণ শিক্ষক। গ্রামের স্কুলে পড়াতে এসেছে। সবার থেকে আলাদা ছিল সে—শিক্ষার্থীদের বন্ধু হয়ে উঠেছিল দ্রুত। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, সে তৃষার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করত।

প্রথম দিনই তন্ময় বুঝতে পেরেছিল, তৃষা অন্যদের চেয়ে আলাদা। সে শুধু বোবা নয়, নিঃসঙ্গও।

তৃষার হাত ধরে কাগজে লিখে তন্ময় জিজ্ঞেস করেছিল, "তোমার কষ্ট হয়?"

তৃষা প্রথমে কিছু লিখতে পারেনি, শুধু চোখের জল ফেলেছিল।

বন্ধুত্বের শুরু

ধীরে ধীরে তৃষা বুঝতে পারল, কেউ একজন আছে, যে সত্যিই তাকে বোঝে। তন্ময় তাকে ইশারার ভাষা শেখানোর চেষ্টা করত, নানা গল্প শোনাত, তার জন্য বই এনে দিত।

একদিন বিকেলে নদীর ধারে বসে তৃষা ইশারায় বলল, "তুমি আমার একমাত্র বন্ধু!"

তন্ময় ম্লান হেসে বলল, "তুমি জানো, বোবা মানুষদেরও স্বপ্ন দেখার অধিকার আছে?"

তৃষা অবাক হয়ে তাকাল। কেউ কখনো তাকে এমন কথা বলেনি।

তন্ময় বলল, "তোমার কণ্ঠস্বর নেই, কিন্তু তোমার চোখ কথা বলে। তোমার মনের ভাষা আমি বুঝি।"

তৃষার চোখ অশ্রুতে ভরে গেল।

কিন্তু সুখের দিনগুলো বেশি স্থায়ী হয় না।

ভালোবাসার অপরাধ

তৃষার বাবা জানতে পারল, তার বোবা মেয়েটি এক যুবকের সঙ্গে সময় কাটায়। তার রাগের সীমা রইল না। একদিন বিকেলে তৃষা তন্ময়ের দেওয়া একটা বই পড়ছিল, বাবা সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিল।

চিৎকার করে বলল, "তুই বোবা! তোকে কি কেউ ভালোবাসবে? তোর জীবন শুধু বোঝা বইতে হবে!"

তৃষা কিছু বলতে পারল না, শুধু অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

বাবা সেদিনই তার বিয়ে ঠিক করে দিল এক ধনী মধ্যবয়সী লোকের সঙ্গে, যে মাতাল আর নৃশংস স্বভাবের। তৃষা প্রতিবাদ করতে চাইল, কিন্তু তার তো কণ্ঠস্বরই নেই!

শেষবার দেখা

বিয়ের আগের রাতে তন্ময় চুপিচুপি এল তৃষার জানালার পাশে।

কাগজে লিখল, "চলো, পালিয়ে যাই!"

তৃষা কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়ল। সে জানে, সমাজ কখনো বোবা মেয়ের ভালোবাসা মেনে নেবে না। তন্ময়ের জীবনও নষ্ট হয়ে যাবে তার জন্য।

তন্ময় তার হাত শক্ত করে ধরল। কিন্তু তখনই বাবার কণ্ঠ শোনা গেল, "কে ওখানে?"

তন্ময় পালিয়ে গেল, আর কখনো ফিরে এল না।

শেষ পরিণতি

বিয়ের দিন সকালে তৃষাকে পাওয়া গেল ঝুলন্ত অবস্থায়, জানালার পাশে।

তার হাতের মুঠোয় ছিল একটা ছোট্ট কাগজ। তন্ময়ের লেখা শেষ চিঠি।

"এই পৃথিবী বোবা ভালোবাসাকে বোঝে না, বোবা কান্না শোনে না… তাই আমি চুপ থাকলাম।"

তন্ময় সেই রাতেই শহর ছেড়ে চলে গেল। কেউ জানে না, সে কোথায়।

আর তৃষা?

সে এখনো হয়তো আকাশের কোনো কোণে রয়েছে। নিঃশব্দ, অথচ বুকে হাজারো আর্তনাদ নিয়ে।

লেখক: মাহাথির মোহাম্মদ,
মদিনাতুল উলুম মাদরাসা, 
দাখিল, দশম শ্রেণি, ঢাকা।

মন্তব্য করুন